হারামণি
বই পর্যালোচনা,  সাহিত্য

হারামণি

‘হারামণি’ নামকরণ সম্পর্কে একটি ইতিহাস আছে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় গ্রামাঞ্চল থেকে সংগৃহীত লুপ্তপ্রায় লোকগীতি প্রকাশের জন্য একটি বিভাগ রাখা হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বিভাগের নামকরণ করেন ‘হারামণি’। এই বিভাগে লোকগীতি প্রকাশিত হত। অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন তাঁর সংগৃহীত লোকগীতি প্রকাশের জন্য সংকলন গ্রন্থের নাম ‘হারামণি’ এখান থেকেই গ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথের দেয়া ‘হারামণি’ তাঁর সংকলন গ্রন্থের জন্যে গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হননি, তাঁর প্রথম খণ্ড ‘হারামণি’র জন্যে তাঁকে দিয়ে একটি ভূমিকা লিখিয়ে নিতে সক্ষম হন।

‘হারামণি’ গ্রন্থের দীর্ঘ ভূমিকায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন বাউল-সংগীত সংগ্রহে প্রবৃত্ত হয়েছেন। এ সন্বন্ধে পূর্বেই তাঁর সঙ্গে আমার মাঝে মাঝে আলাপ হয়েছিল, আমিও তাঁকে অন্তরের সঙ্গে উৎসাহ দিয়েছি। আমার লেখা যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন বাউল পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হত। আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিণীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাত-সারে বাউল সুরের মিলন ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে, তখন আমার নবীন বয়স, শিলাইদহ অঞ্চলেরই এক বাউল কলকাতায় একতারা বাজিয়ে গেয়েছিল-

‘কোথায় পাব তারে
আমার মনের মানুষ যে রে!
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে
দেশ-বিদেশে বেড়াই ঘুরে।’

 

এ পর্যন্ত  মোট ১১ খণ্ড হারামণি প্রকাশিত হয়েছে। দশটি খণ্ডের ধারাবাহিক সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হল।   

আরও পড়ুন গল্পগ্রন্থ নয়ান ঢালী রিভিউ

হারামণি ১ম খণ্ড: ফকির লালন সাঁই এবং চারণ কবি পাগলা কানাই প্রমুখের ১০৪ টি বাউল গান এই খণ্ডে সন্নিবেশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একই ভূমিকা (যা “আশীর্বাদ” শিরোনামে পরবর্তী খণ্ডগুলোতে ছাপা হয়েছে)।  গ্রন্থটি বের হয় ১৩৩৭ বঙ্গাব্দে। অবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের অঙ্কিত একটি বাউলের ছবি এতে সংযোজিত হয়েছে। বইটি কলকাতা থেকে করিম বক্স ব্রাদার্স প্রকাশ করে। ১৩৭৩ বঙ্গাব্দে এর দ্বিতীয় সংস্করণ বের করে হাসি প্রকাশালয়, ঢাকা এবং তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে ঢাকা থেকে মুক্তধারা ১৩৮৩ বঙ্গাব্দে। এই সংস্করণে দুটি প্রবন্ধ (‘বাউল গান’ ও ‘পল্লীগান বাঙালী সভ্যতার ছাপ) সংযুক্ত হয়। 

হারামণি ২য় খণ্ড: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪২ সালে ১৭৩ টি পল্লীগীতি (নওগাঁ থেকে সংগৃহীত) প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে, বাংলা একাডেমী সংস্করণ ১৯৭২ সালে। এই সংস্করণে সাতটি প্রবন্ধ ছাপা হয়। প্রবন্ধ- বাংলার বাউল, গানের ছোড়ানী, পল্লীগানের ভাবধারা, পল্লীগান ধ্বংস হইল কেন? জাগগান, বাংলা সাহিত্য ও মুসলমান, পল্লীগানে ইতিহাসের মালমসলা। 

হারামণি ৩য় খণ্ড: হাসি প্রকাশালয় ঢাকা থেকে ১৯৪৮ সালে পল্লীগানের একটি ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে তৃতীয় খণ্ড প্রকাশ করে। এই খণ্ডে ফকির লালন সাঁই এর গান ছাড়াও বরিশাল, ফরিদপুর, ঢাকা, পাবনা, নোয়াখালী প্রভৃতি অঞ্চলের বিয়ের গান ছাপা হয়।

হারামণি ৪র্থ খণ্ড: ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হারামণি চতুর্থ খণ্ড প্রকাশ করে। এই খণ্ডে বিয়ের গানের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

হারামণি ৫ম খণ্ড: বাংলা একাডেমীর সহযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ গ্রন্থটি ১৯৬১ সালে বের করে। এর যৌথ সম্পাদনায় ছিলেন মুহম্মদ আবদুল হাই এবং মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন। ৩২৫টি ফকির লালন সাঁই ও চারণ কবি পাগলা কানাইয়ের গান এই খণ্ডে সংকলিত হয়। এর দ্বিতীয় সংস্করণ বের করে বাংলা একাডেমী ১৩৯০ বঙ্গাব্দে। এই সংস্করণে সংগ্রাহক ও সম্পাদক হিসেবে মুহম্মদ মনসুরউদ্দিনের ইচ্ছায় তাঁর একক নাম ছাপা হয়। এতে তিনটি প্রবন্ধ রয়েছে – লালন শাহ্‌, ষটচক্র এবং আবদুল হাই রচিত ‘বাউল সাধনা’।

আরও পড়ুন চকখড়ি উপন্যাস রিভিউ

হারামণি ৬ষ্ঠ খণ্ড: প্রকাশক হাসি প্রকাশালয়, ঢাকা। প্রকাশকাল ১৩৭৪ বঙ্গাব্দ। ফকির লালন সাঁই এর দুইশত গান এতে সন্নিবেশিত হয়েছে।

হারামণি ৭ম খণ্ড: বাংলা একাডেমী ৬৮৬ টি ফকির লালন সাঁই এর গান, পাঞ্জু সাঁই ও বিভিন্ন পদকর্তার গান সম্বলিত এই গ্রন্থটি ১৩৭১ বঙ্গাব্দে প্রকাশ করে। এতে বাউল সাধনার সুদীর্ঘ তত্ত্ব ও তথ্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। 

হারামণি ৮ম খণ্ড: বাংলা একাডেমী কর্তৃক ৬৪৬ টি লোকগীতি সম্বলিত হারামণি অষ্টম খণ্ড ১৩৮৩ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়। এতে প্রবন্ধাবলী ছাপা হয়- লোক আধ্যাত্ন সাধনা, লোকবিজ্ঞান, ইসলাম ও ইতিহাস; বাউলের ধর্ম ( প্রবোধ চন্দ্র বাগচী লিখিত); বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত ও রাজশাহী জেলার মেয়েলী গান। 

হারামণি ৯ম খণ্ড: বাংলা একাডেমী ফাল্গুন ১৩৯৪ বঙ্গাব্দে হারামণি নবম খণ্ড প্রকাশ করে। এতে ৬৩৫ টি বিভিন্ন পদকর্তার গান রয়েছে।

হারামণি ১০ম খণ্ড: বিষয়-কবিগানের সংগ্রহ। প্রকাশক বাংলা একাডেমী। প্রকাশ কাল ১৩৯১ বঙ্গাব্দ।

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন। বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!