হযরত-শাহ-মাহতাব-উদ্দিন-শা
পুকুরনিয়া,  সাগরকান্দি

হযরত শাহ মাহতাব উদ্দিন শাহ ছাহেব (রহ.)

হযরত শাহ মাহতাব উদ্দিন শাহ ছাহেব (রহ.)

 

পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার সাগরকান্দি ইউনিয়নের পুকুরনিয়া গ্রামে একজন আল্লাহর পেয়ারা বান্দা হযরত শাহ মাহতাব উদ্দিন শাহ ছাহেব (রহ.) ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে (১২২৩ বঙ্গাব্দে) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাল্যাকাল কাটে আর দশটা ছেলেদের মতোই। শোনা যায়, সাগরকান্দির জমিদার সুরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িতে নলিনী খ্যাপা নামের একজন সাধক ছিলেন। এই সাধক ব্যক্তি গেরুয়া, ঝাড়ি, চিমটা নিয়ে জঙ্গলে বসে সাধনা বা ধ্যান করত। এই সাধক নলিনী মন্ত্র-তন্ত্র জানত। মাধু ফকির এই নলিনী খ্যাপার কাছে দীক্ষা নেন। প্রথমে শাহ মাহতাব উদ্দিন শাহ ছাহেবের নাম ছিল মাধু ফকির। এই মাধু ফকির নলিনী খ্যাপার শিষ্য ছিলেন। নলিনী খ্যাপার মতো তিনি বেশভূষা ধারণ করতেন। হাতে চিমটা, শরীরে গেরুয়া পোশাক, হাতে ঝাড়ি, কপালে তিলক। মাধু ফকিরও তন্ত্র-মন্ত্র জানতেন। তখন তিনি নেশা করতেন। মাধু ফকির এলাকায় পাগলামি করত। পাগলামির কারণে জমিদারের লোক তাকে অনেক দূরের চরে বা কখনো কখনো রাজবাড়িতে ছেড়ে দিয়ে আসত। কিন্তু দেখা যেত ছেড়ে দেবার লোকদের আগেই মাধু ফকির এলাকায় পৌঁছে যেতেন। কীভাবে তিনি পৌঁছাতেন তা বলা কঠিন।

 

আরও পড়ুন উলাট সিদ্দিকীয়া ফাজিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসা

 

এটা তার অলৌকিক ক্ষমতা বলে মনে করা হয়। তখনও তিনি নলিনী খ্যাপার শিষ্য ছিলেন। হঠাৎ একদিন মাধু ফকির বলেন ‘হরির ঘাড়ের ওপর চড়ে দেখলাম আল্লাহ অনেক দূর’। তিনি তারপর থেকে নলিনী খ্যাপার সাথে আর মিশতেন না। নলিনী খ্যাপার সহচর্য ত্যাগ করে তিনি ফুরফুরা শরিফে চলে যান। মাধু ফকির আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হয়ে যান। সেখানে গিয়ে আল্লাহর ওলি গোলাম সোলেমানি (রহ.) এর মুরিদ হন। ফুরফুরা শরিফের ওলি গোলাম সোলেমানি (রহ.) তাকে ওমরে কাজা নামাজ পড়ার জন্য কিছু কালাই দেন বলে জানা যায়। পীরের দরবারে তিনি অবস্থান করতে থাকেন এবং আল্লাহর ধ্যানে মশগুল থাকেন। তিনি বেশ অলৌকিক শক্তির অধিকারী ছিলেন। তিনি বাতাসে ভাসতে পারতেন।

শোনা যায়, লাটের মাদ্রাসায় ফুরফুরা শরিফের হুজুর ওয়াজ করছিলেন। এমন সময় টেলিগ্রাম আসে তার মা অসুস্থ। সেই সময় মাধু ফকির বলেন হুজুরের মা সুস্থ হয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায় মাধু ফকির যা বলেছে তা সত্য। কীভাবে তিনি বাতাসে ভাসতে পারতেন, কিভাবে তিনি দূরের জিনিস দেখতে পারতেন তার প্রকৃত কারণ উদ্ধার করা কঠিন। তবে তিনি তা পারতেন। মাধু ফকিরের আরেকটি অলৌকিক ঘটনার কথা শোনা যায়, জমিদার ও তার ভাইরা তাঁকে ও মাওলানা রইস উদ্দিনকে বন্দুক দিয়ে হত্যা করতে চাইলে তিনি বলেছিলেন তাদের কোন বন্দুক থেকে গুলি বের হবে না। সত্যি সেদিন জমিদার ও তার ভাইদের বন্দুক থেকে শত চেষ্টা করেও গুলি বের করতে পারেন নি।

 

আরও পড়ুন কাসিমুল উলুম মাদ্রাসা এতিমখানা

 

শোনা যায়, মাওলানা রইচ উদ্দিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবার আগে তার সাথে দেখা করে দোয়া চাইতে গেলে তিনি বলেছিলেন তুমি আরবি নিয়ে পড়বে। কিন্তু রইস উদ্দিন তো আরবি পড়েনি বা আরবি জানত না। তাই তিনি ইতস্তুতা করলে মাধু ফকির বলেছিল আমি বলছি তুমি আরবি পারবে। মাওলানা রইচ উদ্দিন সত্যি সত্যি আরবিতে ভালো ফল করতে পেরেছিল। মাধু ফকির জমিদারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। তিনি জমিদারকে অভিশাপ দিয়েছিলেন তার জমিদারী ধ্বংস হয়ে যাবে। জমিদার বাড়িতে শিয়াল, কুকুর বাস করবে এবং ইট খসে খসে পড়বে। পরে সেটাই হয়েছিল। তিনি একজন সাধক ও ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন। ইসলাম ধর্মের প্রচারে তার অবদান উল্লেখ করার মতো।

তিনি এলাকার মানুষের মাঝে ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসারে মাওলানা রইস উদ্দিনকে সাথে নিয়ে তালিমনগরে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার কর্ম তাকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে সাগরকান্দিসহ আশেপাশের মানুষের মনে। এই সাধক পুরুষ ১৩৪৮ সালের ১৩ জ্যৈষ্ঠ (১৯৪১খ্রি.) ১২৬ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তাঁর মাজার পুকুরনিয়া গ্রামে আজও বিদ্যামান। তিন নাই কিন্তু তাঁর নাম, কর্ম আজও তাকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয়; একদিন এখানে একজন সাধক ধার্মিক লোকের বাস ছিল সাগরকান্দির পুকুরনিয়া নামের নিভৃত পল্লীতে। (তথ্যসূত্র: সুজানগরের ইতিহাস, লেখক: ড. আশরাফ পিন্টু )

 

আরও পড়ুন মাওলানা রইচ উদ্দিন

 

হযরত শাহ মাহতাব উদ্দিন শাহ ছাহেব (রহ.) এর জবানবন্দী–

“আমার প্রথম জীবনে ১৭/১৮ বছর বয়সের একজন পরমাসুন্দরী মেয়ের সাথে বিবাহ হয়। বছর কতক পরে মহব্বতের স্ত্রী মারা যান, তখন আমার মাথা কিছুটা খারাপ হলে জংগলে চলে যাই। সেখানে এক সাধুর পাল্লায় পরি। তিনি আমাকে স্ত্রী পাইয়ে দেবেন বলে কঠিন সাধনার রত হতে নির্দেশ দেন। সে মত তপস্যার ফলে স্ত্রীকে স্বপ্নে দেখতে থাকি। কিছুদিন পর তাকে নদীর উপর দিয়ে হেটে যেতে দেখি কিন্তু ধরতে পারি না। তখন আমি আরও ব্যাকুল হয়ে পরি। তখন সাধুর নির্দেশে নদীর চরে বুক পর্যন্ত পুতে ও গাছের ডালে পা বেঁধে মাথা নীচুর দিকে ঝুলিয়ে তপস্যা করতে থাকি। লোকের দেয়া ফলমুল ছাড়া কিছুই খেতাম না। এই রকম কঠিন তপস্যার ফলে স্ত্রীকে নদী পারাপার ও আকাশে উড়তে দেখতাম। সাথে সাথে আমিও নদী পারাপার করতাম এবং আকাশে উড়তাম। কিন্তু ধরতে পারতাম না। এমতাবস্থায় দেখতাম অমুসলিমদের দেবতাদের আকাশে উড়তে, কিন্তু কিছুটা উপরে গিয়ে ফিরে আসছে, শত চেষ্টা করেও আর উপড়ে উঠতে পারছে না।

আমি অবাক হয়ে এই সব কারবার দেখলাম আর উপড়ে উঠার চেষ্টা করতে থাকলাম। এরপর অলৌকিক ভাবে শুনলাম, মাহতাব উদ্দিন এর বেশি উপড়ে যেতে পারবে না। যদি যেতে চাও তাহলে ফুরফুরা শরীফের বড় মওলানা সাহেবের কাছে যাও । কোথায় ফুরফুরা শরীফ আর কে বড় মওলানা কিছুই জানতে পারলাম না। কঠিন তপস্যায় বশীভূত পা আর মন দুটিতে বললাম, চল ফুরফুরায় । মনের নির্দেশে পা দুটি চলতে থাকল। সিরাজগন্জে এসে শিয়ালদহগামী ট্রেনে চড়ে বসলাম। ট্রেনে কত মানুষ আমার কাছে রোগের শিফা চায় । আমি পানি, ধুলা-বালি যা দেই তাতেই সবাই ভাল হয়ে যায়। শিয়ালদহে নেমে থমকে দাঁড়াই। পা দুটিকে বলি চলতে থাক, আবার চলতে থাকে।

 

আরও পড়ুন তালুকদার বাড়ি জামে মসজিদ

 

হ্যারিসন রোড ধরে হাওড়া ময়দানে এসে মার্টিন ট্রেন ধরে শিয়াখালা নামলাম । তখন পা দু’খানা আর চলতে চায় না। পা দুটিকে জোর করে ধমক দিয়ে ফুরফুরা শরীফের আমতলায় নিয়ে আসলাম। সেদিন ছিল শনিবার । বড় হুজুর তখন ওযু করছিলেন। তিনি দেখেই বললেন ”এ দরজা বন্ধ ওই দরজায় যাও। তিনি আঙ্গুল ইশারা করে মুযাদ্দেদে যামান হযরত আবু বকর সিদ্দিক এর দরবারে যাও। আমি তৎক্ষনাত জোরের সাথে বললাম- ” হুজুর আমি এই বন্ধ দোরই খুলব। তখন তিনি আমাকে বসতে বললেন। অতঃপর নাপিতকে লম্বা চুল, গোঁফ কাটতে এবং গেরূয়া বসন খুলে গোসল করতে বললেন । কিছুদিন তার খেদমতে সাধারণভাবে কেটে যায়। এরপর নামাজ-কালাম ও তালীমের নির্দেশ দেন।”

 

মেদিনীপুরের পিয়ারডাংগার পীর সৈয়দ আহমদুল্লাহ বলেন, শাহ সাহেবের অন্তরদৃষ্টি এমন ছিল যে, কবুলিয়তের আলামত পর্যন্ত তিনি দেখতে পেতেন।

বি.দ্র: বড় মওলানা নামে যিনি শাহ সাহেবের পীর ছিলেন তিনি হলেন, কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার শামসুল উলামা, সুলতানুল আরেফিন আল্লামা গোলাম সালমান আব্বাসী (র)।

(তথ্যসূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন কতৃর্ক প্রকাশিত ‘ফুরফুরা শরীফের ইতিবৃত্ত’)

 

আরও পড়তে পারেন জমিদার সুরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং হয়রত শাহ মাহতাব উদ্দিন শাহ ছাহেবকে কেন্দ্র করে লেখা গল্প সুরেন বাবু

 

ঘুরে আসুন আমাদের ফেসবুক পেইজে

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন। বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!