স্বপ্ন-গোধূলি-২য়-পর্ব; www.amadersujanagar.com
আবু জাফর খান (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

স্বপ্ন গোধূলি (২য় পর্ব)

স্বপ্ন গোধূলি (২য় পর্ব)

আবু জাফর খান

 

তিন.

আদালত প্রাঙ্গণে উপচেপড়া ভিড়। লোকে লোকারণ্য। কোথাও একতিল জায়গা খালি নেই। শহর, শহরতলি, এমন কি গ্রাম থেকেও মানুষ ছুটে এসেছে। আজ সেই চাঞ্চল্যকর মামলার রায়। প্রতিটি দৈনিকে মর্মস্পর্শী শিরোনাম করা হয়েছে। লোকজন হামলে পড়েছে খবরটির ওপর।

অরুশিকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো। কালো আলখাল্লায় মোড়া বিচারক এসে এজলাসে বসলেন। আদালতে পিন পতন নিস্তব্ধতা। ব্যারিস্টার এম আলি চুপচাপ বসে আছেন। তিনি নিশ্চিত জানেন, রায় কী হবে। তিনি তাই পরবর্তী করণীয় নিয়ে ভাবছেন। প্রসূন আহমেদ এক কোণে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। তার দৃষ্টি অরুশির মুখে স্থির। তার বুকের ভেতর মহাপ্রলয়ের যে তাণ্ডব চলছে, সে ছাড়া হয়তো আর কেউই তা জানে না। অরুশি নির্বিকার। কোনো ভাবান্তর নেই। তার সজল দুটি আয়ত চোখ ঊর্ধ্বে স্থিত। তার উদাস চোখে একরাশ শূন্যতা। যেন জ্বলে দুটি নির্লিপ্ত তারা মধ্যরাতের উদাসীন আকাশে। সবার মুখ থমথমে। যেন দ্রুত ধেয়ে আসা উন্মাদিনী বৈশাখীর প্রলয় আশঙ্কায় স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে সব।

বিজ্ঞ বিচারক রায় ঘোষণা শুরু করলেন। তাঁর কণ্ঠ বুঝি কেঁপে গেল একটু। …. যেহেতু মিস অরুশি চৌধুরী স্বয়ং খুনের দায় স্বীকার করেছেন, যেহেতু তার দায় খণ্ডনের কোনো দলিলি প্রমাণ কিংবা সাক্ষীর সাক্ষ্য আসামি পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবী আদালতে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, যেহেতু আসামিকে জেরার সময়ও সে তার বক্তব্যে ছিল অনড় এবং যেহেতু আসামিকে বারবার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া সত্ত্বেও সে তার স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করেনি, সুতরাং সে খুনের দোযে দোষী। আদালত এই মর্মে রায় ঘোষণা করছে যে, আসামি মিস অরুশি চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা মোতাবেক মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসির রজ্জুতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হোক।’ আদালত আজকের মতো সমাপ্তি ঘোষণা করা হলো।

আরও পড়ুন গল্প একজন অনন্যা

বিচারক নতমুখে এজলাস থেকে নেমে গেলেন। আদালতজুড়ে সহসা চাপা শোকের ছায়া নেমে এল। কারও চোখে অশ্রু, কেউ বিলাপ করছে, কারও মুখে সংক্ষুব্ধ আস্ফালন। গোটা আদালত চত্বরের বাতাস হঠাৎই যেন মর্সিয়া ক্রন্দনে ভারী হয়ে উঠল। প্রসূন আহমেদ যেভাবে যে কোণে দাঁড়িয়ে ছিল, এখনো সেভাবেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। তার পাথর দুটি চোখ হতে অবিরত অশ্রু ঝরছে।

পরদিন সকল জাতীয় দৈনিকে অরুশি চৌধুরীর করুণ পরিণতির কথা শিরোনাম হয়ে এল। দেশের কোটি জনতা হায় হায় করে উঠল। অকস্মাৎ গোটা দেশের ওপর দিয়ে যেন একটি বিক্ষুব্ধ তুফান বয়ে গেল। এখানে বলে রাখা ভালো, ফাঁসির আদেশ প্রদান করা মাত্রই তা কার্যকর করার বিধান নেই। সেটি কার্যকরী করতে  অবশ্যই হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে। হাইকোর্টও যদি আদেশ বহাল রাখে, তবে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা যায়। সেখানেও ব্যর্থ হলে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা যায়। তিনি সার্বিক বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল করে আসামিকে মুক্তি দিতে পারেন।

 

চার.

অরুশি চৌধুরীর জন্মটাই যেন আজন্ম অপরাধ। দুর্দৈব যেন নিত্য তার পিছু ধাওয়া করে ফেরে। অথচ তার জন্মলগ্নে হেসে উঠেছিল চৌধুরী পরিবার। তাকে নিয়ে দাদু-দিদার আদিখ্যেতার অন্ত ছিল না। নাতনিকে ঘিরে কত স্বপ্ন ছিল তাঁদের। অরুশি পড়াশুনা করে অনেক বড় হবে। কোনো এক যুবরাজের সাথে বিয়ে হবে তার। কিন্তু হায়, তাঁরা যখন স্বপ্নের জাল বুনছিলেন, অদৃষ্ট বুঝি তাঁদের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ক্রূর হাসি হাসছিল।

অরুশির যখন জন্ম হয়, তার বাবার বয়স তখন তেইশ কি চব্বিশ। অরুশির দাদু-দিদা শখ করে তাঁদের একমাত্র সন্তান অরুশির বাবাকে ছাত্রাবস্থায়ই বিয়ে দিয়েছিলেন। নাতনির আগমনে তাই চৌধুরী পরিবারে নেমে এসেছিল সুখের বান। গ্রামসুদ্ধ লোককে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো হয়েছিল।

আরও পড়ুন গল্প সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা

অরুশির দাদু ছিলেন জোতদার। বিপুল ভূসম্পত্তির মালিক ছিলেন তিনি। অরুশির জন্মের তিন বছরের মাথায় তার দাদুর দুরারোগ্য কর্কট রোগ ধরা পড়ে। জলের দামে জমি বিক্রি করে দেদার টাকা ঢেলেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বছরখানেক রোগ যন্ত্রণায় ভুগে অবশেষে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর এক বছর পেরতে না পেরতেই অরুশির দিদাও চলে যান । অরুশির বাবা একেবারে ভেঙে পড়েন। অরুশির বাবা আশিক চৌধুরী যখন দুর্বহ শোক কাটিয়ে ওঠার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন, তখনই পাশের গ্রামের ধুরন্ধর চতুর আলি ঘোষণা করে, সে চৌধুরী পরিবারের সমস্ত সম্পত্তি কিনে নিয়েছে। তার কাছে রেজিস্ট্রি দলিল রয়েছে। খুব শীঘ্রই সে জমি দখলে নেবে।

আশিক চৌধুরীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তা কী করে হয়? তার বাবা তো সিকি সম্পত্তিও বিক্রি করেননি! তবে? নিশ্চয়ই চতুর আলির কোনো কূটকৌশল আছে। সরল প্রকৃতির মানুষ আশিক চৌধুরীর চোখের সামনে ধড়িবাজ চতুর আলি তার বাবার সমস্ত সম্পত্তি দখল করে নিল। সে কিছুই করতে পারল না। তার বাবার গড়া সাম্রাজ্য তারই চোখের সামনে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সে অসহায়ের মতো শুধু তাকিয়ে দেখল।

ভূস্বামী আলফাত চৌধুরীর একমাত্র সন্তান আশিক চৌধুরী এখন দুর্দশাগ্রস্ত এক হতোদ্যম কৃষক। বর্গা জমি চাষ করে কোনোমতে তিনটি মুখের অন্নসংস্থান করেন।

আশিক চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে অরুশি চৌধুরী কিন্তু হতোদ্যম নয়। তার মনে ধিকিধিকি আগুন জ্বলে। প্রতিশোধের আগুন। ধুরন্ধর চতুর আলির ধৃষ্টতা সে একদিন গুঁড়ো গুঁড়ো করে দেবে। মায়ের মুখে চৌধুরী পরিবারের করুণ পরিণতির কথা শোনার পর থেকেই তার ভেতরে প্রতিশোধের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ গুমরে মরে। সে আইনজ্ঞ হয়ে গ্রামে ফিরে চতুর আলির মুখোমুখি দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তাদের সেই অবস্থা কোথায়! কী করে সে শহরে গিয়ে আইন পড়বে! অরুশি জানে না।

আরও পড়ুন গল্প ও রিহানা

অরুশি একসময়ে তার দাদুর পৃষ্ঠপোষকতায় চালিত গ্রামের স্কুল থেকে এসএসসি এবং পাশের গ্রামের কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। একই গ্রামের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছেলে প্রসূন আহমেদ ছিল অরুশির সহপাঠী। অরুশিকে সে ভীষণই পছন্দ করতো। ভালোও বাসতো প্রচণ্ড। কিন্তু বলার সাহস হয়নি কখনো। একদা বিপুল প্রতিপত্তির অধিকারী এবং পরম্পরাগত অভিজাত পরিবারের মেয়ে অরুশি দূরদৃষ্টের নিষ্ঠুর খেলায় এখন নিঃসম্বল পরিবারের এক মেয়ে। তবুও তার সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস সঞ্চয় করতে পারেনি প্রসূন। অরুশির ব্যক্তিত্বের কাছে নিজেকে বিবর্ণ মনে হতো। তাই দূর থেকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো আর ওর কল্যাণ কামনায় বিভোর হয়ে থাকতো সর্বদা।

চৌধুরী পরিবারের মন্দ ভাগ্য আর ধূর্ত চতুর আলির চাতুর্যের কথা প্রসূন তার বাবার মুখে প্রায়ই শুনতো। প্রসূনের বাবা ছিলেন অরুশির দাদুর একনিষ্ঠ ভক্ত। আরফাত চৌধুরীর কথা বলতে গিয়ে প্রসূনের বাবার চোখ জলে ভরে উঠতো। তিনি শিশুর মতো কাঁদতেন। প্রসূন আহমেদের তাই চৌধুরী পরিবার বিশেষ করে অরুশির প্রতি যেমন ছিল প্রবল টান, অনুরক্তিও ছিল ততোধিক। অরুশির প্রতি তার এই নিখাদ ভালোবাসা আর তীব্র অনুভূতির অনুপূরক কিছু তার জীবনে ঘটতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথা মুহূর্তের জন্যও তার মনে হয়নি। এ এক অনির্বচনীয় প্রখর বোধ। যেটি ব্যক্ত করা শক্ত।

প্রসূনের মনের এই প্রপঞ্চিত মায়াটানের বিষয়টি অরুশিরও অজানা ছিল না। তবুও আগাগোড়াই সে ছিল নির্লিপ্ত। কেন তার এই নির্লিপ্তি, কেন এই উদাসীনতার নির্মোক, সে হয়তো নিজেও জানে না। তার পারিবারিক প্রপতনের বিষয়টি নিয়ে সে সর্বদা থাকতো উদ্বিগ্ন। হতে পারে এই উদ্বিগ্নতাই প্রসূনের প্রতি তার ঔদাসীন্যের কারণ। তবে প্রসূনদার প্রতি তার ছিল অগাধ ভরসা এবং আস্থার একটি জায়গা। সহপাঠী হলেও প্রসূন আহমেদকে অরুশি শুরু থেকেই ‘প্রসূনদা’ সম্বোধন করতো।

আরও পড়ুন গল্প রাজামারা

অরুশির আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি করবার আকাঙ্ক্ষা সেই বোধ বুদ্ধি হবার পর থেকেই। কিন্তু বাবার সেই সামর্থ্য কোথায়! অবশেষে তার এক দূরসম্পর্কের ধনবতী খালা এগিয়ে আসেন। তাঁরই আশ্রয়ে এবং সহযোগিতায় অরুশি স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ল’ অনার্সে ভর্তি হয়। ওদিকে প্রসূন আহমেদ ভর্তি হয় ঢাকা ইউনিভার্সিটির অ্যাপলায়েড ফিজিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স বিভাগে। কিন্তু কেউ কারও খোঁজ জানতো না।

অরুশির খালা ছিলেন নিঃসন্তান। তিনি অরুশিকে মেয়ের মতোই স্নেহ করতেন। অরুশির পড়াশুনা এগোচ্ছিল ভালোই। সে বেশ ভালো রেজাল্ট করল ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষায়। এই সময় হঠাৎ করেই একদিন পরিচয় হলো ওরই বিভাগের থার্ড ইয়ারের ছাত্র অরিত্রর সঙ্গে। পরিচয় হলো মানে অরিত্র যেচে এসে অরুশির সাথে আলাপ করল। অরিত্র বেশ চটপটে, সুদর্শন এবং ধোপদুরস্ত ছেলে। দেখলেই বোঝা যায় ধনী ঘরের সন্তান। তবে আচার-আচরণে বেশ মার্জিত।

অরিত্র প্রায়ই অরুশির কাছে আসে। অরুশির অনাগ্রহ সত্ত্বেও কখনো রেস্তোরাঁয় খাওয়ায়, কখনো শপিংমলে নিয়ে গিয়ে জোরাজুরি করে গিফট কিনে দেয়। অরুশির ভালো লাগে না, তবুও যেতে হয়। এভাবেই অরিত্রর প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা তৈরি হয় এবং বিশ্বাসও৷ কারণ, তার প্রতি অরিত্রর প্রখর ভালোবাসা এবং মুগ্ধ বিভঙ্গি দেখতে পেত সে।

কোনো একদিন অরুশির সরল এবং নিখাদ বিশ্বাস ভেঙে খানখান হয়ে যায়। এক অজুহাতে হোটেল কক্ষে নিয়ে গিয়ে তীব্র বাধা সত্ত্বেও অরুশির সবকিছু কেড়ে নেয় অরিত্র। সেটি আসলে কেড়ে নেয়া নয়, জোর করে ছিনিয়ে নেয়া। অরুশির এতকালের অতি যত্নে সাজানো বাগান অকস্মাৎ এক ঝড়ো তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। অরুশি সেদিন হোটেল কক্ষে সর্বস্বান্তই হয়নি কেবল, তার জীবনে আরও একটি ভয়ঙ্কর অঘটন ঘটে।

আরও পড়ুন গল্প বড় বাবা

ভূলুণ্ঠিতা অরুশি ডুকরে কাঁদে। তার সম্মুখে এখন অথই আঁধার। হায় বিশ্বাস, হায়রে ভালোবাসা! গোড়াতেই বলা হয়েছিল, ‘অরুশি চৌধুরীর জন্মই যেন আজন্ম অপরাধ। দুর্দৈব যেন নিত্য তাকে তাড়া করে ফেরে।’ সেটিই আবারও প্রমাণিত হলো। তখন হঠাৎই প্রসূনদার কথা মনে পড়ে অরুশির। প্রসূনদা – এক আশ্চর্য সুন্দর মানুষ। কতদিন তাকে দেখেনি অরুশি! তার খোঁজ পর্যন্ত জানে না, করেওনি কতকাল! “প্রসূনদা, আমার ভীষণ বিপদ! আপনার অরুশির সব শেষ হয়ে গেছে প্রসূনদা!” অরুশি দুহাতে মুখ ঢেকে চিৎকার করে কাঁদে ।

বিধ্বস্ত অরুশি সর্বস্ব খুইয়ে এলোপায়ে ফুটপাথ ধরে হাঁটছে। তার মনের মধ্যে ঝড়ো বাতাসের প্রবল ঘূর্ণি। কী করবে, কোথায় যাবে জানে না সে। সহসা একটি ডাক কানে ভেসে আসে, “অরুশি?” অরুশি ফিরে তাকায়। দেখে, প্রসূনদা ছুটতে ছুটতে আসছেন। অকস্মাৎ অরুশির মনের কোনো এক কোণে অতীন্দ্রিয় এক বোধ উজ্জ্বল আলোর ফুলকি হয়ে জ্বলে ওঠে।

“কী হয়েছে তোমার অরু?” প্রসূন আহমেদের মুখে উৎকণ্ঠার জমাট কালো মেঘ ।

অরুশির বুকের ভেতর কষ্টের তুফান ওঠে। সে প্রসূনদার মতো মানুষকে উপেক্ষা করে এক প্রবঞ্চকের মেকি ভালোবাসার ফাঁদে পা দিয়েছিল। অরুশি কান্নায় ভেঙে পড়ে। শত শত মানুষের সামনে ফুটপাথে দাঁড়ানো প্রসূন আহমেদ অরুশিকে বুকে টেনে নেয়। অরুশি তার প্রসূনদার বুকে মাথা রেখে কাঁদে আর প্রসূন আহমেদের নিশ্চিত নির্ভরতার আশ্বাস, অভয় এবং ভরসা জড়ানো হাত অরুশিকে আঁকড়ে ধরে থাকে। দুচোখ ভরে দেখার মতো দৃশ্য।

আরও পড়ুন গল্প চোখে দেখা নীল কণ্ঠ

‘এক প্রতারক আমার সর্বস্ব লুট করেছে প্রসূনদা। আমায় অপবিত্র করেছে। তার শঠতা আমি বুঝিনি। তার মেকি ভালোবাসার ফাঁদে পা দিয়েছিলাম আমি। সে শুধু আমায় নষ্টই করেনি, জোর করে আপত্তিকর ছবিও তুলেছে। আমি যদি কাউকে কিছু বলি কিংবা তার কথামতো না চলি, তবে আমার অশালীন ছবিগুলো নাকি ইন্টারনেটে আপলোড করে দেবে। আমার সব শেষ হয়ে গেছে প্রসূনদা।” অরুশির চাপা কান্না প্রসূনের মনের ভিত তুমুল কাঁপিয়ে দেয়। যন্ত্রণার ভয়ানক তুফান বারবার ভাঙতে থাকে বুকের বেলাভূমিতে।

“আমি আছি অরুশি। তোমার ঠিক পাশেই আছি। ভয় কী তোমার?” প্রসূন অরুশিকে অভয় দিতে চায়। অরুশির সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। প্রসূনের ভীষণ মন খারাপ হয়ে যায় আর অনিবারণীয় চাপা ক্রোধে দেহের পেশি শক্ত হয়ে ওঠে। সেই কৈশোর থেকে এই মেয়েটিকে ভালোবাসে সে।

পরদিন স্টামফোর্ড ক্যাম্পাসে প্রসূন আহমেদ অরিত্রর মুখোমুখি দাঁড়ায়। রাগে-দুঃখে-ক্ষোভে প্রসূনের চোয়াল শক্ত। অরুশি অনতিদূরে দাঁড়িয়ে।

“অরুশির ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে তোলা নূড ছবিগুলো আর নেগেটিভটি এই মুহূর্তে ফেরত দেবেন আপনি মি. অরিত্র। তা না হলে আপনার লাম্পট্যের চরম মূল্য দিতে হবে আপনাকে। ইউ সান অভ আ বিচ, ভালোয় ভালোয় অতি দ্রুত ফেরত দে ছবিগুলো।” ক্রদ্ধ প্রসূন ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বলে। তার গলার স্বর হিসহিস করে ওঠে।

আরও পড়ুন গল্প পরাজিত নাবিক

“একটু দাঁড়ান, আমি এক্ষণই এনে দিচ্ছি।” অরিত্রর কণ্ঠে ভয়। অরিত্র ফিরে এসে প্রসূনের সামনে দাঁড়ায়। প্রসূন হাত বাড়িয়ে বলে, “ছবিগুলো দিন।” অরিত্র এক ঝটকায় লুকনো হাত বের করে। সে হাতে ছবির বদলে চকচক করছে ছুরি। প্রসূন চোখের পলকে অরিত্রর হাত ধরে ফেলে। দুজনের ধ্বস্তাধ্বস্তির এক পর্যায়ে অরিত্রর হাত থেকে ছুরি খসে পড়ে মাটিতে গেঁথে যায় কিছুটা। নিমেষে অরিত্র উপুড় হয়ে ছুরির ওপর গিয়ে পড়ে। অরিত্রর বুকের কাছ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরচ্ছে আর হতভম্ব প্রসূন বোকার মতো নির্বাক দাঁড়িয়ে ভাবছে, একি হলো!

প্রসূন আহমেদকে পুলিশ গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। সে দ্বিরুক্তি না করে নির্দ্বিধায় খুনের দায় স্বীকার করে। তাকে থানার গারদে ঢুকানো হয়।

গভীর রাত। প্রসূন থানা হাজতের এক কোণে বসে ভাবছে, এই ভালো হলো। সে অন্তত অরুশির জীবনকে নিষ্কণ্টক করতে পেরেছে। তার কাছে এরচেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না। আহ! কী শান্তি। প্রিয়জনের জন্য কিছু করতে পারার আনন্দের চেয়ে অপার আনন্দ এই পৃথিবীর বুকে আর কী আছে!

দেখতে দেখতে একটি রাত পেরিয়ে গেল। সূর্য তখন সবে পুবাকাশে উঁকি দিচ্ছে। সেন্‌ট্র এসে গারদের তালা খুলে প্রসূনকে বের করে বলল, “আপনি যেতে পারেন। আপনি মুক্ত।” বিস্মিত প্রসূন আহমেদ অবাক দৃষ্টিতে সেট্রির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, “মানে?” প্রত্যুত্তরে সেন্‌ট্র বলে, “মানে হলো, প্রকৃত অপরাধী স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে পুলিশের হাতে নিজেকে সোপর্দ করেছে। যে ছুরি দিয়ে ভিকটিমকে আঘাত করা হয়েছিল, আলামত হিসেবে সেটিও জমা দিয়েছে। সুতরাং আপনি মুক্ত।” বিস্ময়াবিষ্ট প্রসূন আহমেদ কিছুক্ষণ সেনট্রির দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করে, “কে সে? কী নাম তার?” সেন্‌ট্র জবাব দেয়, “অরুশি চৌধুরী।”

আরও পড়ুন অশরীরী আত্মা

প্রসূন আহমেদ বজ্রাহতের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। তার সমস্ত শরীর অসাড়। নড়বার শক্তি নেই। কী হলো! কেন হলো! একি করল অরুশি! তার দুচোখ হতে অবিশ্রান্ত ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। “আমি একটু অরুশির সাথে দেখা করতে চাই।” অসম্বর অশ্রু মুছে প্রসূন সেন্‌ট্রকে মিনতি করে বলে। “সেটি এখানে সম্ভব নয়। কারাগারে যাবার পর দেখা করতে পারবেন।” সেন্‌ট্র অন্যত্র চলে গেল।

প্রসূন আহমেদ উন্মন দৃষ্টি মেলে কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। অতঃপর স্খলিত পায়ে থানা থেকে বেরিয়ে আসে। তার মাথার মধ্যে ঘুরেফিরে বারবার একটি প্রশ্নই উঁকি দিতে থাকে, ‘অরুশি ছুরিটি পেল কিভাবে?’ সে বুঝতেও পারেনি, হতবুদ্ধি প্রসূন আহমেদ যখন বিভীষিকাময় দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে বিমূঢ় দাঁড়িয়ে ছিল, তখন অরুশি এসে ছুরিটি নিয়ে দূরে সরে যায়। প্রসূনের কিছু হোক, তা চায়নি সে।

আরও পড়ুন স্বপ্ন গোধূলি-
১ম পর্ব
শেষ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

স্বপ্ন গোধূলি (২য় পর্ব)

Facebook Comments Box

কবি ও কথাশিল্পী আবু জাফর খান নিবিড় অন্তর অনুভবে প্রত্যহ ঘটে চলা নানান ঘটনা, জীবনের গতি প্রকৃতি, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, ব্যক্তিক দহনের সামষ্টিক যন্ত্রণা তুলে আনেন নান্দনিক উপলব্ধির নিপুণ উপস্থাপনায়। তাঁর লেখায় ধ্বনিত হয় বিবেক কথনের অকৃত্রিম প্রতিভাষা। প্রকাশনা: কাব্যগ্রন্থ-পাথর সিঁড়িতে সূর্যাস্ত বাসনা, অনির্বেয় আকাঙ্ক্ষায় পুড়ি, যে আগুনে মন পোড়ে, যূপকাঠে যুবক, একটি জিজ্ঞাসাচিহ্নের ভেতর, সোনালী ধানফুল, রাতভর শিমুল ফোটে, বীজঠোঁটে রক্তদ্রোণ ফুল, স্যন্দিত বরফের কান্না, প্রত্নপাথর মায়া; গল্পগ্রন্থ-মাধবী নিশীথিনী, পথে পথে রক্ত জবা, উপন্যাস-মেখলায় ম্যাগনোলিয়ার মুখ, জ্যোৎস্নায় ফুল ফোটার শব্দ, কুমারীর অনন্তবাসনা, জ্যোৎস্নাবাসর, মেঘের বসন্তদিন, রূপোলী হাওয়ার রাত, একাত্তরের ভোর, তৃতীয় ছায়া। তিনি ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জানুয়ারি পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত আহম্মদপুর ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। 

error: Content is protected !!