স্বপ্ন-গোধূলি-১ম-পর্ব
আবু জাফর খান (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

স্বপ্ন গোধূলি (১ম পর্ব)

স্বপ্ন গোধূলি (১ম পর্ব)

আবু জাফর খান

 

এক.
মহিলা ওয়ার্ডের প্রায় অন্ধকার কক্ষের দেয়াল ঘেঁষে পায়ের আঙ্গুলের ওপর ভর দিয়ে ঘুলঘুলিতে চোখ রেখে আকাশ দেখার বৃথা চেষ্টা করছে মেয়েটি। কতকাল সে ভোরের আকাশ দেখেনি। আজ কি মেঘ করেছে? এত অন্ধকার কেন? মাঝে মাঝে মেঘের মৃদুগম্ভীর ডাক কানে আসছে যেন।

এটি কোন মাস মেয়েটি কিছুতেই মনে করতে পারে না। শুধু মনে পড়ে, কৈশোরে প্রত্যুষে প্রাতঃকৃত্য সেরে খিড়কি দ্বার খুলে পায়ে পায়ে গাঁয়ের মেঠোপথের কিনারে গিয়ে দাঁড়িয়ে তন্ময় হয়ে পূবাকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত সে। ভোরের মোলায়েম বাতাসে গা জুড়িয়ে যেত। পূবের ফিকে লাল আকাশ ক্রমশ রক্তবর্ণ হয়ে উঠত এবং অতঃপর আরক্ত আভার ভেতর দূরের গাছ-গাছালির আড়াল হতে লাল বলের মতো নরম সূর্য লাফিয়ে উঠত তরুশিরে। কতকাল আগের কথা! অথচ এখনো স্পষ্ট চোখে ভাসে। মেয়েটির চোখ ভিজে ওঠে। নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

মেয়েটির নাম অরুশি চৌধুরী। মহিলা ওয়ার্ডের সবাই তাকে অরু বলে ডাকে। পাঁচ বছর হলো সে কারাগারে বন্দী। ছলছল মায়াবী চোখে পাপের কোনো চিহ্ন নেই। নিষ্কলুষ মুখ, মায়াকাড়া চেহারা। মুখের দিকে তাকালে বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে। অরুশি খুনের মামলার আসামি। আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে সে। নিঃসঙ্কোচে খুনের দায় নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছে। যা সচরাচর ঘটে না।

আরও পড়ুন গল্প হাইয়া আলাল ফালাহ

বিচারক অরুশির স্বীকারোক্তিতে চমকে উঠেছিলেন। তাঁর দীর্ঘদিনের জজিয়তির অভিজ্ঞতায় তিনি স্পষ্ট বুঝেছিলেন, মেয়েটি খুনি নয়। তবু কেন সে খুনের দায় নিজ কাঁধে তুলে নিচ্ছে! তিনি বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু মেয়েটি ছিল অবিচল। নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হন। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মেয়েটি ছিল স্থির, অচঞ্চল । বিচারক হতাশ হন। সেও প্রায় পাঁচ বছর আগের কথা।

মহিলা ওয়ার্ডের বয়োজীর্ণ কয়েদিটি ঝাপসা চোখে অরুশির দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা। এই আলো-আঁধারি কক্ষটিতে প্রায় দেড়যুগ কেটে গেছে তাঁর। যেন মৃত্যুর শরণাগারে শেষ যাত্রার অপেক্ষায় তিনি। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এই বয়োবৃদ্ধার চোখের সামনে কতজন এল-গেল; কিন্তু এই মেয়েটির প্রতি কেন যেন পাড়-ভাসা মমতা তাঁর। মেয়েটির দিকে তাকালেই তাঁর বুকের ভেতর খাঁ খাঁ করে ওঠে। মেয়েটির ভাগ্যে কী ঘটতে চলেছে বুড়ি স্পষ্ট দেখতে পান।
“মাসি তুমি কাঁদছো?” অরুশি বৃদ্ধার কাছে এসে বসে। সে বৃদ্ধাকে মাসি ডাকে।
“কইরে বাছা, কাঁদছি না তো! চোখে যেন কী হয়েছে, শুধু শুধু জল গড়ায়। অন্ধ হয়ে যাব বুঝি।”
“কেন লুকচ্ছো মাসি?”
বৃদ্ধা পরম আদরে অরুশিকে বুকে টেনে নেন। অরুশির চোখ আবার জলে ভরে ওঠে। বৃদ্ধার বুকভাঙা কান্নায় কক্ষের গুমট বাতাস আরও ভারী হয়ে যায়। আজ অরুশির মামলার রায়। বৃদ্ধা জানে কী রায় অপেক্ষা করছে হতভাগীর কপালে। হয়তো অরুশিও জানে।

আরও পড়ুন রোদেলা দুপুর কাঁদে

সকাল সাড়ে সাতটা। কারা চিকিৎসক, সর্বপ্রধান কারারক্ষী, একজন জমাদার এবং দুজন সিপাই মহিলা ওয়ার্ডের দরজায় এসে দাঁড়াল। জামাদার রশি টানতেই ভেতরে ঘণ্টি বেজে উঠল। মহিলা কারারক্ষী দরজা খুলে দিল। সুবেদার বললেন, “স্যার আরুশিকে চেকআপ করবেন। তার আজ আদালতে হাজিরা আছে। তাকে রেডি হতে বলো।”
“সে রেডি স্যার।” মহিলা কারারক্ষী বলল।

জেল ডক্টর ভেতরে ঢুকলেন। অরুশি সুন্দর এক সেট সালওয়ার কামিজ পরেছে। চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। সবার মুখ থমথমে। কারও কারও চোখে জল। কেবল অরুশির মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। সে স্থির এবং অচঞ্চল। হঠাৎই কেন যেন কারা-চিকিৎসকের মন খারাপ হয়ে গেল। মেয়েটির প্রতি এক ধরনের মায়া জন্মে গেছে। আসলে মেয়েটির পরিশীলিত আচরণ, সবার জন্য ছুটোছুটি করে কাজ করার প্রবণতায় সে সকলের মাঝে বিশেষ আদরের জায়গাটি তৈরি করে নিয়েছে বহু আগেই।
“অরু, কেমন আছ?” ডক্টরের কণ্ঠস্বর কাঁপা। অরুশি তার ভাসাভাসা সজল আয়ত চোখ তুলে কিছুক্ষণ ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “জী স্যার, ভালো।”
অরুশি মুখ নিচু করল। ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস চেপে বেরিয়ে এলেন। মন বিষণ্ণ ।

 

দুই.
যে কোনো মামলার বিচারকার্য পরিচালনায় বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষকেই ল-ইয়ার নিয়োগ করতে হয়। কিন্তু কেন যেন গোড়া থেকেই অরুশি এই বিষয়ে ছিল প্রচণ্ড নিস্পৃহ। তার যেন কোনো কিছুতেই কিছু এসে যায় না। যা হয় হোক, এমনই এক ধরনের প্রবণতা ছিল তার মধ্যে। তার এই নিস্পৃহতা সকলকে অবাক করত। পুষ্পভরণা এমন সুগন্ধি তরুণীর জীবনের প্রতি কেন এই ঔদাসীন্য কেউ তা জানে না। তার নির্লিপ্ততার কারণও কারো জানা নেই।

কারা কর্তৃপক্ষ বিধি মাফিক উকিল নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু অরুশি ওকালতনামায় সই করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। কী অদ্ভুত! মেয়েটি যেন জীবন থেকে পালানোর দৃঢ় সংকল্পে অনড়।

আরও পড়ুন পথভোলা এক পথিক

অরুশি তখন সবে তিনমাস কারাবন্দী। সেই তিনমাসে কেউ তাকে একবারও দেখতে আসেনি। তবে কি দুই কুলে তার কেউ নেই? কেউ থাকুক আর না থাকুক, এক যুবক সেই তিনমাসে পিতৃকুলে যৎসামান্য যা ছিল, সর্বস্ব বিক্রি করে দেশের এক খ্যাতিমান আইনজ্ঞের দ্বারে দিনের পর দিন ধন্না দিচ্ছে। সেই তিনমাস যুবক পাগলের মতো ছুটে বেড়িয়েছে। কখনো ছুটে গেছে গ্রামের বাড়িতে, কখনো পত্রিকা অফিসে, আবার কখনো ব্যারিস্টার এম আলির কাছে। দুচোখে নিকষ অন্ধকার জড়ানো তটহীন উত্তাল সাগরের বুকে দিশেহারা এক নাবিক সে। কী করবে, কোন পথে যাবে কিছুই তার জানা নেই। ধু-ধু মরুর বিবিক্ত বালিয়াড়ির বুকে সে একা। কী করে সে বাঁচাবে অরুশিকে! যুবকের মুখে সব শুনে ব্যারিস্টার এম আলি কেসটি লড়বার সিদ্ধান্ত নেন। যুবকের মুখ সহসা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে বুঝি নিবন্ত মাটির প্রদীপে ক্ষীণ আলোর রেখা দেখতে পায় ।

দেশের প্রায় প্রতিটি জাতীয় দৈনিকে অরুশি নামক বিপন্না মেয়েটির জীবনের মর্মন্তুদ ঘটনার করুণ কাহিনী ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত হয়। মানুষ হায় হায় করে ওঠে। মেয়েটির জন্য অসংখ্য মানুষ নিভৃতে চোখের জল ফেলে । নানা উপাসনালয়ে তার মুক্তি কামনায় প্রার্থনা করে বিভিন্ন বর্ণের অগুনতি মানুষ। দুর্ভাগী মেয়েটি অযুত মানুষের মনোগহিনে বেদনার প্রতিভূরূপে আসন পেতে বসে।

অরুশির কারাবাসের তিনমাসের মাথায় তাকে জানানো হয়, দুজন সাক্ষাৎপ্রার্থী তার জন্য অপেক্ষা করছে। সে কিছুটা চমকায়। কারা আসতে পারে, ঠিক আন্দাজ করতে পারে না। সে ভীরু পায়ে দুরুদুরু বুকে মহিলা কারারক্ষীর হাত ধরে ভিজিটিং রুমে ঢোকে ।

আরও পড়ুন স্বপ্ন জল

অরুশি প্রসূনদার দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে। বিগত তিন মাসে মানুষটি শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে গেছে। চোখ কোটরগত। একদা স্বাস্থ্যবান সুদর্শন তরুণের তিন মাসেই কী হাল হয়েছে শরীরের। শীর্ণকায় তরুণ সজল চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কী ভীষণ কাতর চাহনি। তাকাবার ভঙ্গিতে একরাশ ক্লান্তি, বিষাদ আর অসহায়ত্ব। প্রসূনদার পাশেই অভিজাত চেহারার এক ভদ্রলোক বসে আছেন। অরুশি এক নজরে সবকিছু দেখে মুখ নিচু করে। তার চোখে জল ।
“অরুশি, ইনি ব্যারিস্টার এম আলি। বাংলাদেশের নামকরা আইন বিশারদ। তোমার মামলা ইনিই পরিচালনা করবেন। দয়া করে তুমি একটু সহযোগিতা করো। তোমার স্বীকারোক্তি তুমি প্রত্যাহার করে নাও অরু। প্লিজ অরু, প্লিজ!” প্রসূন আহমেদ করজোড়ে মিনতি জানায়। তার কণ্ঠ রুদ্ধ । দুচোখ জলে ভরা।
“সেটি তো সম্ভব নয় প্রসূনদা। মূল্যহীন জীবন আমার। আমার বাঁচা-মরায় কিইবা আসে যায়! একটি ক্ষয়িত, গলিত, বিনষ্ট জীবনের মুক্তি তো জীবনাবসানেই! কেন অযথা সময় নষ্ট করছেন প্রসূনদা? ফিরে যান।” অরুশির চোখ বান ডাকা নদী। তার কথা বলার শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে। তার শুধু মনে হয়, এই মানুষটি এত ভালো কেন? সবাই যদি প্রসূনদার মতো হতেন!
“না অরু না, তোমার কিছুই হয়নি! তুমি আবার বেঁচে উঠবে। ভোরের অরুণিম উৎসবে আবার ভাসবে তুমি। শুধু একটু সাহায্য করো আমায়।”
“তা আর হয় না প্রসূনদা! প্লিজ আপনারা যান! আর কখনো আসবেন না।”

শুধু প্রসূন আহমেদ নয় কিংবা ব্যারিস্টার এম আলি নন, কারাগারের অনেকেই অরুশিকে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। বিগত পাঁচ বছরে প্রসূন আহমেদ এবং ব্যারিস্টার সাহেব একবার দুবার নয়, অসংখ্যবার কারাগারে এসেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অরুশিকে ওকালতনামায় সই করানো ছাড়া স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারে রাজি করানো সম্ভব হয়নি। তবুও ব্যরিস্টার এম আলি অরুশিকে বাঁচাতে বিগত পাঁচ বছর আদালতে প্রাণপণ যুদ্ধ করে গেছেন। কিন্তু তাঁর মতো আইনজ্ঞের অজানা থাকবার কথা নয়, মামলার রায় কী হতে পারে।

আরও পড়ুন স্বপ্ন গোধূলি-
২য় পর্ব
শেষ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

স্বপ্ন গোধূলি (১ম পর্ব)

Facebook Comments Box

কবি ও কথাশিল্পী আবু জাফর খান নিবিড় অন্তর অনুভবে প্রত্যহ ঘটে চলা নানান ঘটনা, জীবনের গতি প্রকৃতি, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, ব্যক্তিক দহনের সামষ্টিক যন্ত্রণা তুলে আনেন নান্দনিক উপলব্ধির নিপুণ উপস্থাপনায়। তাঁর লেখায় ধ্বনিত হয় বিবেক কথনের অকৃত্রিম প্রতিভাষা। প্রকাশনা: কাব্যগ্রন্থ-পাথর সিঁড়িতে সূর্যাস্ত বাসনা, অনির্বেয় আকাঙ্ক্ষায় পুড়ি, যে আগুনে মন পোড়ে, যূপকাঠে যুবক, একটি জিজ্ঞাসাচিহ্নের ভেতর, সোনালী ধানফুল, রাতভর শিমুল ফোটে, বীজঠোঁটে রক্তদ্রোণ ফুল, স্যন্দিত বরফের কান্না, প্রত্নপাথর মায়া; গল্পগ্রন্থ-মাধবী নিশীথিনী, পথে পথে রক্ত জবা, উপন্যাস-মেখলায় ম্যাগনোলিয়ার মুখ, জ্যোৎস্নায় ফুল ফোটার শব্দ, কুমারীর অনন্তবাসনা, জ্যোৎস্নাবাসর, মেঘের বসন্তদিন, রূপোলী হাওয়ার রাত, একাত্তরের ভোর, তৃতীয় ছায়া। তিনি ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জানুয়ারি পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত আহম্মদপুর ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। 

error: Content is protected !!