সুরেন-বাবু-২য়-পর্ব
কে এম আশরাফুল ইসলাম (গল্প),  গল্প,  জমিদার,  তালিমনগর,  পুকুরনিয়া,  শ্যামসুন্দরপুর,  সাগরকান্দি,  সাগরকান্দি ইউনিয়নের ইতিহাস ও ঐতিহ্য,  সাহিত্য

সুরেন বাবু (২য় পর্ব)

সুরেন বাবু (২য় পর্ব)

কে এম আশরাফুল ইসলাম

 

মাধু পাগল। তাঁর বংশ পরিচয় সঠিকভাবে জানা যায়নি। শ্যামগঞ্জ হাট সংলগ্ন গ্রামের নাম পুকুরনিয়া। প্রবীণ এলাকাবাসীর বিশ্বাস তিনি অন্য এলাকা থেকে সাগরকান্দির পুকুরনিয়া গ্রামে এসে মুসাফিরের ন্যায় মো. আলী আকবরের পিতার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। যদিও আশ্রয় প্রদানকারী বংশ তাঁকে ঐ বংশের লোক বলেই পরিচয় দেন এবং নিজেদেরকে পরিচিত করাতে ইজ্জত ও গৌরবের বিষয় মনে করেন।

বর্ণাঢ্য জীবনের কিংবদন্তি এই মাধু পাগল। সাধু, দরবেশ, সন্ন্যাসির লেবাসে থাকতেন। কখনো ধুতি পাঞ্জাবি, গলায়  জপমালা, হাতে চিমটা। কখনো লাল গেরুয়া বসন। তিনি গাজায়  আসক্ত ছিলেন। কথিত আছে, বালিয়াডাঙ্গী গ্রামের সাত্তার নায়েবের বাড়ির পাশে মুচি বাড়ি সংলগ্ন একটা শ্যাওড়া গাছ ছিল। তিনি রাতের বেলায় সেই শ্যাওড়া গাছে বাদুরের মতো ঝুলে থাকতেন। দুই পা ডালের সাথে মুচড়িয়ে মাথা নিচের দিকে দিয়ে ঝুলতেন। মানুষ তাঁকে সংসার বিরাগী পাগল বলেই বিশ্বাস করত। আবার কেউ কেউ বলেন তিনি নাকি বিয়ে করেছিলেন। একটা মেয়েও নাকি তাঁর ছিল।

এই মাধু পাগল হিন্দু সন্ন্যাসিদের আস্তানায় যাতায়াত করতেন। হিন্দু রীতি অনুযায়ী যোগাসন, ধ্যান, আরাধনা করে হিন্দু ধর্মের সর্বশেষ ধাপে উপনীত হোন। শ্মশানে বসে তান্ত্রিক সাধনা পর্যন্ত করেছেন। কেউ কেউ তাঁকে ব্রহ্মচারী মাধু বলে ডাকতেন। এলাকায় দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত হয় না। ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির। দাবদাহে ফসল পুড়ে যাচ্ছে। গাছপালা মারা যাচ্ছে। পানির হাহাকার। এক বিভীষিকাময় অবস্থা। শ্যামসুন্দরপুরের মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু লোক গেলেন তাঁর কাছে। বিষয়টা তাঁকে খুলে বললেন এবং তাঁর কিছু করণীয় থাকলে সাধ্যানুযায়ী করার জন্য সবাই সবিনয়ে অনুরোধ জানালেন।  তিনি নিরবে সব শুনে বললেন, “তোমরা কিছু কাঠ খড়ি যোগাড় করে আনো।” উপস্থিত লোকেরা তাঁর কথা অনুযায়ী সব ব্যবস্থা করে শ্যাওড়া গাছতলায় নিয়ে গেলেন। মাধু  সেগুলো সেখানে রেখে সবাইকে চলে যেতে বললেন। 

আরও পড়ুন গল্প সোনালী

সবাই যার যার মতো বাড়িতে চলে গেলেন। মাধু কাঠ খড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া মাত্রই প্রচণ্ড ধুম্রকুণ্ডলি পাকিয়ে আকাশ মেঘে ছেয়ে গেল। আষাঢ়ের গর্জনের মতো মেদিনী প্রকম্পতি করে মেঘের লীলা শুরু হলো। শুরু হলো একটানা মুষলধারে বৃষ্টি। মাঠ-ঘাট, খাল, বিল পানিতে ভরপুর। মুহুর্মুহু রঙিলা ব্যাঙের ধ্বনিতে পরিবেশ সবুজে-শ্যামলে হেসে উঠলো। এই প্রথম মাধুর কারামতি মানুষ দেখতে পেলো। মাধু আর দৃশ্যপটে নেই। তিনি উধাও।

অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশ ব্রিটিশ শাসনের শিকার। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তাঁর মাথায় খেলা করে। মাধু শ্যাওড়াতলায় কারামতি ঘটিয়ে পদব্রজে উপস্থিত হলেন পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার তৎকালীন ভারত উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক ওলির দরবারে। তিনি মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখতেন, কে যেনো শ্বেত শুভ্র পোশাক পরিহিত অবস্থায় তাঁকে অন্য এক মুক্তির জগতে আহবান করেছন। অকুতোভয় মাধু দরবেশ (সন্ন্যসির লেবাসসহ) ফুরফুরার জমিনে পা দেওয়া মাত্রই তাঁর ভিতরে এক শিহরণ জাগে। তিনি আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। তাঁর শরীর কাঁপতে থাকে। যে মাধু অমাবস্যার নিকষ গভীর রজনীতে শ্মশানে বসে সাধনা করতে ভয় পায়নি, সেই মাধু আজ  অজানা ভয়ে শঙ্কিত।  ভাবান্তর দেখা দেয় তাঁর মনে। বদ্ধমূল ধারণা লীলায়িত তাঁর মনের কন্দরে। তিনি বুঝি তাঁর স্বপ্নের জগতে পদার্পণ করেছেন।  এইখানেই বুঝি তাঁর মোক্ষম মুক্তির অনির্বাণ অবিনাশী ঐশী জ্যোতির সাক্ষাৎ ঘটবে।  

ফুরফুরার দরবারে কামেল আধ্যাত্মিক মোরশেদের সংস্পর্শে তিনি সুদীর্ঘ তিন যুগ কঠোর সাধনার মাধ্যমে কামালিয়াত অর্জন করেন। এরপর একজন খাস আল্লাহর আউলিয়া হয়ে তাঁর মোরশেদ প্রদত্ত নাম হযরত শাহ মাহতাব উদ্দিন (র) এই নামে খ্যাত হয়ে পুকুরনিয়া গ্রামে পুনরায় আগমন করেন। আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীর পর অবসর সময় তিনি শ্যামসুন্দরপুর কাটাতেন। কারণ ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানে কিছু সংস্কৃতবান ইসলামি ধাঁচের  উচ্চ শিক্ষিত লোক ছিল। তাছাড়া এই গ্রাম থেকে সাগরকান্দি বাজার এবং বাবুজির রাজকীয় প্রাসাদ দেখা যেত।

আরও পড়ুন গল্প হাতের চুড়ি

ফুরফুরা থেকে আসার পরপরই তিনি যে একজন খাঁটি আল্লাহর ওলি শ্যামসুন্দরপুরবাসী তা উপলব্ধি করতে পেরেছিল। গ্রামবাসী তাঁর আন্দোলনের কথা বুঝতে পেরে, হাতে হাত রেখে বাইয়াত হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেকোনো সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখার শপথ নিলেন। তখন থেকেই শ্যামসুন্দরপুর যে এলাকা থেকে তিনি আশ্রয় এবং সহমর্মিতা পেলেন; সেই এলাকার নামকরণ করলেন,”তালিমনগর”। ‘তালিম’ অর্থ ‘শিক্ষা’ আর ‘নগর’ অর্থ ‘কেন্দ্র’- এই অর্থে শ্যামসুন্দরপুর গর্ভে জন্ম নিল ‘তালিমনগর’ নামক নতুন এক গ্রাম। অদ্যবধি অত্র গ্রামে যেকোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে তাঁর নামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনপূর্বক উক্ত প্রতিষ্ঠানের নামের পূর্বে “শাহ মাহতাব উদ্দিন”- নামটি সংযোজিত হয় আবশ্যিকভাবে এবং তাঁর প্রদত্ত গ্রামের নামের হাকিকত উজ্জ্বল দিবালোকের ন্যায় সত্যে পরিণত হয়েছে।

ঘটনাটি  বাবুজির কর্ণগোচরে যেতে সময় লাগে না। তাঁকে বাবুজির দরবারে তলব করা হলো। তিনি একাই গেলেন। 

-কীরে মাধু। মাধু থেকে মাহতাব হয়ে গেলি। তা উদ্দেশ্য কী?

-উদ্দেশ্য কিছুই না। আপনার ধর্ম আপনি পালন করবেন, আর আমার ধর্ম আমি পালন করবো। কেউ কারো বাধা হয়ে দাঁড়াবো না। 

-খুব বড় বড় কথা শিখেছিস দেখছি।

-বাড়িয়ে বলার কিছুই নেই। পৃথিবীর কোনো ধর্মেই জবরদস্তি নেই। দেখেন বাবুজি, হিন্দু ধর্মের কোনো ঘটনাই আমার অজ্ঞাতে নেই; কারণ হিন্দু ধর্মেই আমি প্রথমে দীক্ষা গ্রহণ করে সাধনার সর্বশেষ তোরণে উপনীত হই। অতএব, আমার বা মুসলমানদের ধর্ম কর্ম পালনে বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না। এতে আপনার ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না।

আরও পড়ুন হযরত শাহ মাহতাব উদ্দিন শাহ ছাহেব (রহ.)

শাহ মাহতাব উদ্দিন (র) এর কথাগুলোকে বাবুজি তাঁর বিরুদ্ধে বিশাল দুঃসাহস আর চ্যালেঞ্জ বলে মনে করলেন। আগের মাধু আর এই মাহতাবের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। কী শক্তি তাঁকে বাবুজির সামনে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলার শক্তি যোগায়? কী পেয়েছে সে ফুরফুরার দরবার থেকে? কোন শক্তির বলে মাধু আজ বলীয়ান যে, মাধু তাঁকে হুমকি দিয়ে গেলো। বাবুজি নিজে হুমকি দিবেন কি, তিনি নিজেই উল্টো হুমকি পেলেন।   

দিন যায়। দিনের আলো আঁধারে হারায়। বাবুজি দুষ্টু ফন্দি আঁটে। রাতের গভীরতা বাড়তে থাকে। বাবুজি তাঁর ফরমায়েশের তাবেদার এমন খাস লোকদের ডেকে বললেন, “মাহতাবকে ধরে নিয়ে সবার অগোচরে উত্তাল পদ্মা নদীর মাঝে ফেলে দিয়ে আয়!” যেমন আদেশ, তেমন কাজ। মাহতাবকে তারা রাতের গভীরে খরস্রোতা পদ্মার গর্ভে বিসর্জন দেয়। মাহতাব একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন। তিনি মহানের রহস্যলোকে নিজকে হারিয়ে ফেলেছেন।

বাবুজির লোক-লস্কর বিসর্জন কাজ সমাপ্ত করে গন্তব্যে পৌঁছার পূর্বেই মাহতাব তাদের সম্মুখে অক্ষত শরীরে উপনীত। তাদের চক্ষু চরখ গাছ। এ কি করে সম্ভব? ঘটনাটা বাবুজির কান পর্যন্ত গড়ায়। ভাবান্তরে পড়েন বাবুজি। ঘটনাটা কাউকে না বলার জন্য বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ ধরণের পাশবিক ঘটনা বাবুজি অনেকবার ঘটিয়েছে। এমনকি হাত-পা বেঁধে ফেলে দেওয়ার পরও একই কারামতি ঘটেছে। তিনি সাতবার পদ্মাগর্ভে নিক্ষিপ্ত হয়ে কুমিরের সাথে সংগ্রাম করে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছেন। সবই ছিল নির্বোধ বাবুজির খেয়াল খুশি। তবুও বাবুজির বোধোদয় হয়নি। মাহতাব বাবুজিকে একদিন বললেন,“নির্বোধ জমিদার। তোর জমিদারি থাকবে না। তোর বিজয়ের দিন শেষ। পতন ত্বরান্বিত। অত্যাচার করে কেউ টিকতে পারে না। বিশ্ব ইতিহাস তার উজ্জ্বল সাক্ষী।

আরও পড়ুন সুরেন বাবু গল্পের-
১ম পর্ব
শেষ পর্ব

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

সুরেন বাবু (২য় পর্ব)

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন। বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!