সুজানগরের-নামকরণের-ইতিহাস
উপজেলার ইতিহাস,  সুজানগর উপজেলা

সুজানগরের নামকরণের ইতিহাস

সুজানগরের নামকরণের ইতিহাস

 

পাবনা জেলার সুজানগরের পূর্বনাম ছিল গোবিন্দগঞ্জ। মোগল সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালের শেষভাগে তার পুত্রদের মধ্যে রাজ সিংহাসনের দখল নিয়ে যে বিরোধের সূত্রপাত হয় তার ধারাবাহিকতায় যুবরাজ শাহ সুজা আরাকানে পালিয়ে যান। তিনি আরাকানে গমনকালে সুজানগরে ৩ রাত অবস্থান করেন। যুবরাজ শাহ সুজার এই অবস্থানকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য এতদঞ্চলের মানুষ এ জনপদের নামকরণ করেন সুজানগর। রাধারমণ শাহা তার ‘পাবনা জেলার ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, “মোগল আমলে শাহ সুজা একদা ঢাকা গমন সময়ে পদ্মাতীরে এখানে কিয়ৎদিনের জন্য অবস্থান করেন, তখন হইতে এই স্থানের নাম সুজানগরে পরিণত হইয়াছে।”

মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের ইচ্ছায় তার ছোটবেলার বন্ধু, ঘনিষ্ঠ সহচর ও প্রধান সেনাপতি ইসলাম খাঁ ১৬০৫ সালে বাংলা ও বিহারের রাজধানী রাজমহল হতে সরিয়ে ঢাকায় আনেন। ইসলাম খাঁ আগ্রা থেকে ঢাকা এই দীর্ঘ পথটি যতটুকু সম্ভব স্থল পথে ও বাকিটুকু যমুনা, গঙ্গা নদী হয়ে পাবনা জেলার সুজানগর অঞ্চলটির পাশ ঘেষে বয়ে চলা পদ্মা নদী হয়ে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী শহর ঢাকা এসে পৌঁছেন। মোঘল সম্রাটের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও রাজ আমত্যগণও যোগাযোগের জন্য এই পথটি সর্বদা অনুসরণ করতেন।

আরও পড়ুন সুজানগর উপজেলার ইতিহাস

ইসলাম খাঁ ই প্রথম ব্যক্তি যিনি পাবনা অঞ্চলটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে নিদারুণ ভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। যাত্রাপথে প্রায়ই সুজানগর কিংবা পার্শ্ববর্তী এলাকার কোথাও তিনি তার তাবু ফেলে অবকাশ উপভোগ করতেন কয়েকদিন। পাবনার মধ্য দিয়ে দুলাই, চরগোবিন্দপুর ও কাশিনাথপুর হয়ে ইছামতি নামে যে নদীটি যমুনায় গিয়ে মিশেছে সেটি ইসলাম খাঁ নিজ উদ্যোগে খনন করেছিলেন। পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে সুজানগর নামক এই স্থানটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের কথা গোপন ছিল না আগ্রার রাজমহলেও। মোঘল সাম্রাজ্যের অধিকাংশ সম্রাটই প্রাকৃতিক দৃশ্য, গাছপালা, পশু-পাখি অসম্ভব পছন্দ করতেন।

সম্রাট জাহাঙ্গীর একজন অসামান্য সৌখিন ও শিল্পানুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। উপরন্তু তিনি ছিলেন ফলিত ও জ্যোতির্বিদ্যার প্রতি অসম্ভব অনুরক্ত। তার শাসন আমলে তিনি তৈরি করেছিলেন ৪৬ রকমের মুদ্রা। ১৬১৮ সালে জাহাঙ্গীরের মাথায় এক উদ্ভট খেয়ালের জন্ম হলো। তিনি তার তঙ্কশালার সমস্ত মোহর রাশিচক্রের প্রতীকগুলোর মুদ্রাঙ্কনে সমৃদ্ধ করার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন এবং সে ইচ্ছেও তামিল হলো খুব দ্রুত। একেকটি মুদ্রায় শোভা পেল রাশিচক্রের একেকটি জাতকের চিহ্ন।

জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর তার পুত্র খুররম যিনি শাহজাহান নাম ধারণ করেন, তিনি ছিলেন প্রচণ্ড ধার্মিক ও গোঁড়া একজন শাসক। সিংহাসনে বসেই তিনি ফরমান জারি করলেন যে, মনুষ্য ও জীব-জন্তুর ছবি সম্বলিত সব মুদ্রা সংগ্রহ করে গলিয়ে নতুন করে মুদ্রা তৈরি করতে হবে। যেখানে কোন মানুষ কিংবা জীব-জন্তুর ছবি থাকবে না। আর যদি কারো কাছে এরূপ ছবিযুক্ত মুদ্রা পাওয়া যায় তবে সেই ব্যক্তিটিও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবে। শাহজাহানের নির্দেশ অনুযায়ী সঙ্গে সঙ্গেই সমস্ত মুদ্রা রাজ্যের সর্বস্তর থেকে তুলে আনা হল। সেই সাথে শাহজাহানের টাকশালে আরো যেসব অসংখ্য মুদ্রা ছিল সেগুলোও সব একত্রে গলিয়ে ফেলা হল।

আরও পড়ুন সুজানগর পৌরসভার ইতিহাস

সম্রাট শাহজাহানের ছিল তিন পুত্র- শাহজাদা দারাশুকো, শাহসুজা ও আওরঙ্গজেব। এই তিন জনের মধ্যে দারাশুকো ছিলেন সবচেয়ে জ্ঞানী, বিদ্যান ও সংস্কৃতিমনা। তিনি সেই রাশিচক্রের প্রতীক যুক্ত কয়েক বস্তা স্বর্ণমুদ্রা লুকিয়ে ফেললেন কোন এক দুর্ভেদ্য জায়গায়। ১৬৪১ সালের সম্রাট শাহজাহান তার মধ্যম পুত্র শাহ সুজাকে বাংলা ও বিহারের শাসন কর্তা নিযুক্ত করে তাকে পাঠালেন ঢাকায়। ঢাকার বড় কাটরায় শাহ সুজা তৈরি করলেন তার মহল। আর সেখান থেকেই তিনি বাংলা ও বিহারের শাসনকার্য পরিচালনা করতে লাগলেন। তার এই শাসন আমলে তিনি ঢাকা থেকে আগ্রা কিংবা আগ্রা থেকে ঢাকা তার এই যাতায়াতের পথ হিসাবে পদ্মা নদীটিকেই বেছে নিয়েছিলেন এবং এই সুজানগরের পাশ দিয়েই তিনি সবসময় যাতায়াত করতেন। সুজানগরের ভূপ্রকৃতি তাকে এতটাই আকৃষ্ট করেছিল যে, তিনি প্রায়ই সেখানে তাবু ফেলে সুজানগর অঞ্চলটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতেন। সেই সময়ে এ অঞ্চলটি ছিল প্রচুর বৃক্ষ ও ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ।

তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন, এসব জঙ্গল সাফ করে যদি বসতি স্থাপন করা যায়, তবে নিশ্চই এটি মনুষ্য বসবাসের একটা আদর্শ, মনোহর ও উপযুক্ত স্থান হিসাবে গণ্য হতে পারে। কিন্তু কিভাবে তিনি করবেন এই অসাধ্য সাধন। তার কোষাগারে তো পর্যাপ্ত অর্থের যোগান নেই। আগ্রায় ফিরে গিয়ে তিনি তার এই অভিপ্রায় ও মনোবাসনার কথা তার ভ্রাতা দারাকে খুলে বললেন। দারাশুকো তার সহদর সুজার মুখে এসব কথা শুনে খানিক চিন্তা করে বললেন- উপায় একটি আছে বটে। ভাইয়ের মুখে আশার বাণী শুনে সুজার চোখে মুখে আলো ফুটে উঠল। কী সেই উপায়? দারাশুকো সুজাকে বললেন তার কাছে কয়েক বস্তা স্বর্ণমুদ্রা রয়েছে যা বেশ কিছুকাল আগে তাদের পিতা সম্রাট শাহজাহান বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। সুজা চাইলে সেই মুদ্রাগুলো ব্যবহার করতে পারে, তার ভালোলাগার সেই জায়গাটির বন-জঙ্গল পরিষ্কার করার কাজে।

আরও পড়ুন বিল গাজনার ইতিহাস

দারাশুকো ছিলেন অসামান্য বুদ্ধিমান একজন মানুষ। তিনি অল্প মুদ্রা ব্যয় করে ঢের বেশি কাজ আদায় করে নেয়ার জন্যে একটি অভিনব উপায় বের করলেন। তিনি শাহসুজাকে উপদেশ দিলেন এক বস্তা স্বর্ণমুদ্রা ও সঙ্গে একটি কামান নিয়ে যেতে। মুদ্রাগুলোর জন্য কামানটি কেন প্রয়োজনীয় সে বিষয়টিও তিনি শাহ সুজাকে ভাল করে বুঝিয়ে দিলেন। সম্ভবত ১৬৫২ সালে শাহ সুজা পাইক পেয়াদা ও বরকন্দাজ সমেত আগ্রা থেকে ঢাকা ফেরার পথে বস্তা ভর্তি স্বর্ণমুদ্রা, কামান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে যাত্রা বিরতি করলেন সুজানগরে।

দূর-দূরান্তে লোক পাঠিয়ে খবর পৌঁছে দেওয়া হলো যে, সুজানগর অঞ্চলের ঝোপঝাড় ও বনাঞ্চলগুলোতে কামান দেগে স্বর্ণমুদ্রা ছিটানো হবে। যদি কেউ সেই স্বর্ণমুদ্রা পেতে চায় তাহলে তাকে জঙ্গলের গাছপালা কেটে সেই মুদ্রা সংগ্রহ করতে হবে। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন এলো সেই লোভে পড়ে। তারপর কামানের নলের ভেতর স্বর্ণমুদ্রা ভরে সেটি দাগানো হলো বিভিন্ন জঙ্গল ও ঝোপঝাড় লক্ষ্য করে । অপেক্ষারত মানুষজনও দা, কুড়াল ও হাঁসুলি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল জঙ্গলের বুক চিরে সেই স্বর্ণমুদ্রা তুলে আনতে।

১৬৬০ সালের উত্তর প্রদেশের ফতেপুরে তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা আওরঙ্গজেবের সঙ্গে তিনি যুদ্ধে হেরে যান। আরাকানে পলায়ন কালে, তিনি সুজানগরে কয়েকদিন অবস্থান করেছিলেন। এ এলাকার মানুষজনও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখিয়ে এ অঞ্চলটি তার নামেই নামকরণ করেন।

 

তথ্যসূত্র: ১। পাবনার ইতিহাস, লেখক: রাধারমণ শাহা

               ২। শরৎচন্দ্রের শরৎ উপখ্যান ও অন্যান্য গল্প, লেখক: সাইফুর রহমান

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

সুজানগরের নামকরণের ইতিহাস

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন। বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!