সাক্ষাৎকার-এম-আবদুল-আলীম
সাক্ষাৎকার,  সাহিত্য

সাক্ষাৎকার: ড. এম আবদুল আলীম

সাক্ষাৎকার: ড. এম আবদুল আলীম

 

“পড়া পড়া পড়া এবং লেখার মধ্যেই খুঁজতে চাই মানবজন্মের পরম প্রাপ্তি এবং চরম সার্থকতা!”

এম আবদুল আলীম

[ড. এম আবদুল আলীম বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য সন্ধানী গবেষক। পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার গৌরীগ্রামে ১৯৭৬ সালের ১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণকারী এই গবেষক এ পর্যন্ত ত্রিশখানা গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। স্নাতক  (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম স্থান এবং স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় লাভ করেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে চাকুরি করেছেন সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ ও ঢাকা কলেজে। বর্তমানে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। একই বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান এবং মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রিজেন্ট বোর্ডের সদস্য হিসেবেও।

ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি শুরু। সাহিত্য-ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো : ‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ’, ‘ত্রিশোত্তর বাংলা কাব্যে বিচ্ছিন্নতার রূপায়ণ’, ‘সবুজপত্র ও আধুনিক বাংলা সাহিত্য’, ‘রবীন্দ্রনাথ উত্তর-আধুনিকতা ও বাংলা ভাষার বিশ্বায়ন’, ‘শহীদ কাদরীর ত্রিভুবন’, ‘বাংলা কাব্যের স্বরূপ ও সিদ্ধি-অন্বেষা’, ‘বাংলা বানান ও উচ্চারণবিধি’, ‘বন্দে আলী মিয়া কবি ও কাব্যরূপ’, ‘রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন : জেলাভিত্তিক ইতিহাস’, ‘বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন’, ‘আওয়ামী লীগ ও ভাষা-আন্দোলন’, ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’, ‘পাবনা অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি’, ‘পাবনায় ভাষা-আন্দোলন’, ‘সিরাজগঞ্জে ভাষা আন্দোলন’, ‘আনিসুজ্জামান’, ‘সুচিত্রা সেন’ প্রভৃতি। তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থ ‘পাবনার ইতিহাস’ ও ‘আনিসুজ্জামান-বক্তৃতাসম্ভার’; সম্পাদিত পত্রিকা ‘সাহিত্য গবেষণাপত্র’, ‘উদ্ভাবন’, ‘প্রভাতফেরি’, ‘রুদ্র’, ‘কালবৈশাখী’, ‘সাঁথিয়ার কণ্ঠ’ ‘গৌরীগ্রাম বার্তা’ ইত্যাদি। গবেষণার স্বীকৃতি-স্বরূপ লাভ করেছেন ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার’।

গত ১ জুলাই, ২০২১ এই ঐতিহ্য-সন্ধানী গবেষক এবং শিক্ষাবিদের সঙ্গে আলাপনের জন্যে মুখোমুখি হয়েছিলেন ‘আমাদের সুজানগর’ ব্লগ ওয়েবসাইটের সম্পাদক ও প্রকাশক প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন। আলাপনটি ‘আমাদের সুজানগরের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা করা হলো। এ আলাপন থেকে একজন প্রতিশ্রুতিশীল গবেষক ও শিক্ষাবিদের বেড়ে ওঠা, তাঁর শিক্ষা ও কর্মজীবন এবং সর্বোপরি নতুন প্রজন্মের একজন গবেষক হিসেবে তাঁর দায়বদ্ধতা ও দেশমাতৃকার ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-অন্বেষণে একাগ্রতা ও নিষ্ঠা সম্পর্কে জানা যাবে।]

ড. এম আবদুল আলীম; ছবিটি পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান থাকাকালীন
আমাদের সুজানগর : করোনার কালে কেমন আছেন? সময় কাটাচ্ছেন কীভাবে?

এম আবদুল আলীম : চারদিকে মৃত্যু, রোগ-শোক। এর মধ্যে কি ভালো থাকা সম্ভব? না, ভালো নেই। একে একে কাছের মানুষগুলো করোনার ছোবলে মৃত্যুবরণ করেছেন। মাথার ওপর থেকে সড়ে গেছে বড়ো বড়ো ছায়া। বিশেষ করে কারোনার ছোবলে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার, বাংলা একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খান স্যার, সাংস্কৃতিক ব্যক্তি কামাল লোহানী প্রমুখের মৃত্যুতে কষ্ট পেয়েছি খুব। এ ক্ষতি কেবল আমার নয়, পুরো জাতির। এমন একেকজন মানুষ গড়ে উঠতে বহু সময় লেগেছিলো, হাঁটতে হয়েছিলো বহু সাধনা ও সংগ্রামের পথ। এ ক্ষতি অপূরণীয়। এঁরা ছাড়াও দুই বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের অনেক মহিরুহ কারোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর এক বছরে এত বুদ্ধিজীবীকে আর কখনোই হারাতে হয় নি আমাদের।

আমার আব্বাও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং কঠিন যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। করোনা খুব ভয়ঙ্কর ভাইরাস, যাকে তুলনা করা যায় সুনামির সঙ্ঘে; সুনামি যেমন প্রকৃতি ও মানবজীবনে ভয়াবহ তাণ্ডব চালায়, করোনাও একইভাবে মানবদেহকে তছনছ করে দেয়। এই মরণঘাতি ভাইরাস যাদের আক্রান্ত করেছে, তারাই জানে এর ভয়াবহতা। করোনায় এ ভয়াবহ কালটা পড়ে এবং লিখে কাটাচ্ছি। স্ত্রী-সন্তান-স্বজনদের সময় দিচ্ছি। ছোট ছোট আনন্দ, দুঃখ-কষ্ট ভাগ করে নিচ্ছি। অনলাইন পত্রিকা পড়ে এবং অনলাইনে নানা আলোচনা ও অনুষ্ঠানাদি দেখেও কাটাচ্ছি সময়। সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব প্রভৃতিতেও চোখ রাখি দেশ-দুনিয়ার খবরাখবর জানতে। পড়া-লেখার ফাঁকে রান্নার কাজ বা ঘরকন্নাও সামলাচ্ছি কখনো-কখনো। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি, নিচ্ছি অনলাইন ক্লাস। সবচেয়ে বেশি যে কাজটি করছি, তা হলো নিজেকে ঝালিয়ে নেয়া; যা পড়া হয়নি কিংবা যা পড়েছি কিন্তু সেভাবে অনুধাবন করতে পারি নি, সেসব বই, পত্র-পত্রিকাও পড়ছি বারবার। এভাবেই কাটছে আমার করোনার কাল।

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি-র সঙ্গে ড. এম আবদুল আলী
আমাদের সুজানগর : যতদূর জানি আপনার জন্ম গ্রামে, বেড়েও উঠেছেন সেখানে, জানতে চাই আপনার বেড়ে ওঠার গল্প।

এম আবদুল আলীম : হ্যাঁ, আমার জন্ম গ্রামে। গ্রামটির নাম গৌরীগ্রাম; পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলায়। জন্মতারিখ ১৯৭৬ সালের ১ ডিসেম্বর। যৌথ পরিবারের বৃহত্তর গণ্ডির মধ্যে আমার বেড়ে ওঠা। থাকতাম নানির কাছে। বলা যায়, নানির আঁচলের ছায়ায় বেড়ে ওঠেছি। পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম। নানির বাড়ি পাশের গ্রামে, শিবরামপুরে। খোলামেলা পরিবেশ। খেলাধুলা, হৈ-হল্লা করে কাটাতাম সেই দিনগুলো। শুনতাম নানা কেচ্ছা-কাহিনি, দেও-দানবের গল্প। পাটকাঠির মাথায় আঠা লাগিয়ে চাঁদিফাটা রোদে ঘুরতাম ফড়িং শিকার করতে। গ্রামের বাগানের ঝোপ-ঝাড়ে পাখির বাসা খোঁজা, বিভিন্ন ফল খাওয়া এবং গাছের ডালে ডালে ছুটে বেড়ানো অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলো।

ঘুড়ি উড়াতাম; কল্পনার রঙিন পাখায় ভর করে উড়তাম আকাশে। কখনো পুকুর-বিলে সাঁতার কাটতাম। বর্ষাকালে বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দেও তুলনা আর কিছুর সঙ্গেই চলে না। মুষলধারার বৃষ্টির মাঝে বাড়ি ফেরার পথে একদিন পাট ক্ষেতের ধারে ভূত দেখে ভয় পেয়েছিলাম। পরে বুঝেছি ভূত নয়, মানুষ ভূত! খেলতাম মনের সুখে; বৌচি, গোল্লাছুট, নোনতা, ইচিং বিচিং ছিচিং ছা প্রভৃতি। মামার কাঁধে আমার নানির কোলে ঘুড়তাম পাড়ায় পাড়ায়। এমন আনন্দঘন আর দুরন্ত ছিলো আমার বেড়ে ওঠা। কষ্ট পাই এমন শৈশব আমার সন্তানেরা পেলো না বলে।

আমাদের সুজানগর : আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে জানাতে চাই; আপনাদের কালের শিক্ষাব্যবস্থা এবং এ কালের শিক্ষার মধ্যে কি কোনো পার্থক্য দেখতে পান? আমাদের শিক্ষার রথ সামনে এগিয়েছে, না পিছিয়েছে?

এম আবদুল আলীম : আমার প্রথম শিক্ষক পল্লির প্রকৃতি এবং পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডল। লেখাপড়ায় হাতেখড়ি আব্বার কাছে। তারপর ভর্তি হই গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে, যার নাম ৪৪ নং হাঁড়িয়াকাহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলায় অবস্থিত। এরপর সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, সাঁথিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছি। আমরা খুব বেশিদিন আগের মানুষ নই। আশির দশকের শুরুরর দিকে আমরা যখন স্কুলে গিয়েছি তখন এরশাদের স্বৈরশাসন জেঁকে বসেছে জাতির ঘাড়ে। দিব্বি মনে আছে আমাদের স্কুলে জলপাই রঙের গাড়িতে এসে ভোট নিয়ে যেতো এরশাদের লোকেরা। কেজি স্কুলের তখনও তেমন বিস্তার ঘটেনি গ্রাম-বাংলায়। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোই সকল শিশুর পঠন-পাঠনের প্রধান কেন্দ্র ছিলো।

পড়া আদায়ের জন্যে স্কুলে নানারকম শাস্তির ব্যবস্থা ছিল; কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা, নীল ডাউন করে রাখা, চুলের ছিপ ধরে টানা, হাতের আঙুলের ভেতর পেন্সিল দিয়ে চেপে ধরা, টেবিলের নিচে মাথা দিয়ে পেছনে বেতানি দেওয়া; এসব ছিল স্কুলের প্রতিদিনের দৃশ্য। মারামারির মতো গুরুতর অপরাধের শাস্তি হিসেবে এক হাতে চুলের মুঠি ধরে আরেক হাতে জোড়া বেত নিয়ে পিঠে সপাৎ সপাৎ দাগ বসিয়ে দেওয়া হতো। অনেকের শার্ট ভেদ করে লাল রং বের হয়ে আসতো। এসবের পাশাপাশি শৈশবের স্কুলে আনন্দও ছিলো খুব। দল বেঁধে স্কুলে যাওয়া, এর-ওর গাছের নানা ফল পেড়ে খাওয়ার আনন্দই ছিলো আলাদা। স্কুল ছুটি হলে রাস্তার পাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে শরীর চাপমুক্ত করার যে আনন্দ তার তুলনা আর কিছুর সঙ্গেই চলে না। প্রাইভেট পড়ার চল ছিলো। শিক্ষকদের বাড়িতে গিয়ে পড়া ছাড়াও গৃহশিক্ষক বাড়িতে এসে পড়াতেন।

আরও পড়ুন বিশেষ সাক্ষাৎকার: ড. আশরাফ পিন্টু

আমরা স্কুলশিক্ষকের বাড়ি গিয়ে তো পড়তামই, বাড়িতে এসেও কয়েকজন শিক্ষক বারো মাস পড়াতেন। স্পষ্ট মনে আছে গৃহশিক্ষকের মাইনে ছিলো মাসে পঞ্চাশ টাকা। কয়েকজন গৃহশিক্ষকের নাম এখনো মনে আছে; আবুল কালাম, আলতাফ হোসেন ও ওসমান গনি। হাইস্কুল, কলেজেও প্রাইভেট পড়েছি। ভবতোষ স্যার এবং ইউসুফ আলী স্যারের কাছে অতি মনোযোগ দিয়ে গণিত পড়েও এসএসসিতে ডাব্বা মেরেছিলাম। সত্যিকারের শিক্ষক পেলাম কলেজে ভর্তি হয়ে, অনেকের কথা মনে আছে; কিন্তু ইংরেজির প্রভাষক মোফাজ্জল হোসেন মুকুল সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছেন চেতনার আকাশে। স্বপ্ন দেখাতেন এবং তা বাস্তবায়নে প্রশিক্ষণ দিতেন। আমার মতো গেঁয়ো ভূতকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির উপযোগী করে তিনিই গড়েছিলেন। ফলে কোচিং ছাড়াই সে বৈতরণী পার হয়েছিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক গুণী শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছি; তাঁদের মধ্যে চির-সমুজ্জ্বল অধ্যাপক ড. আবদুল খালেক; শিক্ষক হিসেবে যেমন, তেমনি মানুষ হিসেবেও। একালের মতো ডিজিটাল-প্রযুক্তির প্রচলন আমাদের কালে ছিলো না। ফলে এখনকার শিশুদের মতো আমাদের হাতের নাগালে তথ্যভাণ্ডার ছিলো না। আমার ছেলে যখন মোবাইল টিপে টিপে নানা তথ্য বের করে আনে আমার সে সুযোগ ছিলো না। শিক্ষকের শাসন যেমন ছিলো, তেমনি বাবা-মায়ের ছিলো কঠোর নজরদারি। আমাদের বাড়িতে সূর্যাস্ত আইন চালু ছিলো। এখনকার অভিভাবকদের মতো তাঁদের এত অবসরই ছিলো না যে, সারাদিন সন্তানকে নিয়ে স্কুলে বসে থাকবে। নানান অবক্ষয় থাকলেও শিক্ষার রথ এগিয়েছে। সরকার বিনামূল্যে পাঠ্যবই দিচ্ছে, মোবাইলে পৌঁছে দিচ্ছে বৃত্তির টাকা। এটা অবশ্যই শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের বড় সাফল্য। শিক্ষার আলো শিক্ষার্থীদের চেতনায় এবং সমাজদেহে ততটা বিচ্ছুরিত না হলেও সমাজের উচ্চ সার্টিফিকেটধারী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। তাছাড়া শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে চাকুরিজীবী ও কর্মী মানুষের সংখ্যাও।

গুরু ড. এম আবদুল খালেকের সঙ্গে শিষ্য ড. এম আবদুল আলীম
আমাদের সুজানগর : লেখালেখিতে কীভাবে এলেন? বাংলা বিভাগের ছাত্র এবং শিক্ষক হয়ে ইতিহাস-ঐতিহ্যের গবেষণায় কেন ঝুঁকলেন?

এম আবদুল আলীম : প্রপিতামহ ইশারত আলী মৃধা ছিলেন আষাঢ়ে গল্পের রাজা; পাশের বাড়ির ভোমর কামারের দহলিজে বসতো তাঁর গল্পের আসর; মারতেন হাতি-ঘোড়া, রাজা-উজির! পিতামহের ঝুলিতেও ছিলো নানা কেচ্ছা-কাহিনি; সন্ধ্যা হলেই বাড়ির আঙিনায় মাদুর পেতে বসে সেসব শোনাতেন। পল্লিচিকিৎসক পিতার পুঁথিপাঠের সুর এখনো কানে বাজে! জঙ্গনামা, সোনাভান, ইউসুফ-জোলেখা প্রভৃতি পুঁথি পড়তে পড়তে রাত গভীর হয়ে প্রদীপের তেল ফুরিয়ে গেলে সুরের তাল ঠিক রেখে বলতেন : ‘শোনো শোনো শোনো চাচি কেতাব পড়া শোনো।/বাত্তিতে ত্যাল নাই চাচি ত্যান ভর‌্যা আনো। এ কথা শুনে দাওয়ায় উপস্থিত আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার হাসির ঝঙ্কারে রাতের নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে যেতো।

আর আমার শিশুমন কল্পনার পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে চলে যেতো কারবালার প্রান্তর কিংবা ফোরাত নদীর পারে। ছোট্টবেলার খেলার সাথীদের কথা মনে পড়ে। খেলতে খেলতে তাদের সঙ্গে আওড়াতাম ‘ইচিং বিচিং ছিচিং ছা,/প্রজাপতি উড়ে যা।’ শুধু কি তাই? তাদের সঙ্গে টো টো করে বেড়াতাম; খুঁজতাম পাখির বাসা, ধরতাম ফড়িং, উড়াতাম ঘুড়ি আর কাটতাম সাঁতার। পারিবারিক এবং পারিপার্শিক এমন আবহে আমার চেতনায় সাহিত্যের বীজ বোপিত হয় সেই শৈশবেই।

আব্বার সংগ্রহে থাকা বিচিত্র ধরনের বই পড়ে এবং স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে সাহিত্যের বিচিত্র ভুবনে অবগাহনের সুযোগ ঘটে। বিভিন্ন সময় অংশগ্রহণ করেছি রচনা-প্রতিযোগিতায়। লেখালেখির জগতে প্রবেশ এভাবেই। কলেজে পড়ার সময় ইংরেজির শিক্ষক মোফাজ্জল হোসেন মুকুল যে সাহিত্যবোধ উস্কে দিয়েছিলেন; বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করতে গিয়ে তা বিস্তৃত হয়। ঐ সময় সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তির সান্নিধ্য যেমন পাই, তেমনি পুরনো-নতুন অনেক পত্রিকা পাঠের সুযোগ লাভ করি। গবেষণায় হাতেখড়ি স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণাপত্র রচনার সুবাদে; এবং সেটা ঘটেছিল কবি অনীক মাহমুদ এবং ফোকলোরবিদ ড. আবদুল খালেকের মাধ্যমে। পাবনা অঞ্চলের নিভৃত পল্লিতে ঘুরে ঘুরে ফোকলোরের বিচিত্র উপাদান সংগ্রহ করে রচনা করি পাবনা অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি নামক গবেষণাপত্র, যা ২০০৮ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়, আমার প্রথম বই সেটিই।

আরও পড়ুন  মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের ফোকলোর সাধনা

মতিহারের সবুজ চত্বরে সাহিত্য-আড্ডায় প্রায়ই মিলিত হতাম কাহ্নপা সাহিত্যচক্রের আসরে, যার মধ্যমণি থাকতেন কবি-গবেষক অনীক মাহমুদ; আমার লেখালেখিতে আসার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরক তিনিই। পত্রিকার পাতায় প্রথম লিখি ২০০২ সালে; সেটা ছিল একটি পুস্তকের আলোচনা, প্রকাশিত হয় দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য সাময়িকীতে। লোকসংস্কৃতি বিষয়ে গবেষণার হাতেখড়ি হলেও পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণা করি ত্রিশোত্তর বাংলা কাব্যের প্রধান পাঁচ কবি জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে এবং অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা নিয়ে; যা পরে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমি থেকে। সৃজন ও মননশীলতার বিচিত্র ভুবনে অবগাহনের সুযোগ ঘটলেও আমি থিতু হই মননশীলতা তথা প্রবন্ধ-গবেষণার জগতে। সাহিত্য, ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তৃত পঠন-পাঠন এবং গভীর অনুসন্ধিৎসায় ডুবে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া এবং উল্লাপাড়া বিজ্ঞান কলেজ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, ঢাকা কলেজ এবং পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুবাদে রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, পাবনা এবং ঢাকায় বসবাসসূত্রে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-জগতের নবীন-প্রবীণ অনেক মানুষের সান্নিধ্য-সংস্পর্শে যাওয়ার সুযোগ ঘটে।

মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, মযহারুল ইসলাম, আনিসুজ্জামান, পবিত্র সরকার, আবদুল খালেক, হাসান আজিজুল হক, আহমদ রফিক, বদরুদ্দীন উমর, ওমর আলী, নূহ-উল-আলম লেনিন, বিশ্বজিৎ ঘোষ, রফিকউল্লাহ খান, আকতার কামাল, গোলাম মুরশিদ, শামসুজ্জামান খান, আলী আনোয়ার, হায়াৎ মামুদ, কামাল লোহানী, মজিরউদ্দীন মিয়া, জুলফিকার মতিন, আবুল হাসনাত, অনীক মাহমুদ, আবুল আহসান চৌধুরী, পি এম সফিকুল ইসলাম, আবুল হাসান চৌধুরী, স্বরোচিষ সরকার, সুজিত সরকার, মহীবুল আজিজ, মাহবুবুল হক, কামাল চৌধুরী, বিশ্বজিৎ ঘোষ, গিয়াস শামীম, সৈয়দ আজিজুল হক, সফিকুন্নবী সামাদী, শহীদ ইকবাল,

শিমুল মাহমুদ, আবু দায়েন, অনিরুদ্ধ কাহালী, তারিক মনজুর, মোহাম্মদ আজম, তুহিন ওয়াদুদ, সরোয়ার মুর্শেদ, শামীম রেজা, শামীম সিদ্দিকী, তপন বাগচী, সাজ্জাদ আরেফিন, সাইমন জাকারিয়া, আমিনুর রহমান সুলতান, সাইদ হাসান দারা, নুরুন্নাহার মুক্তা, রকিবুল হাসান, ওবায়েদ আকাশ, সোহেল হাসান গালিব, মামুন সিদ্দিকী, বাকীবিল্লাহ বিকুল, জি. এম. মনিরুজ্জামান, আশরাফ পিন্টু, চন্দন অনোয়ার, হারুন পাশা, তাশরিক-ই হাবিব, বিপ্লব হুমায়ুন, তানভীর দুলাল, রহমান রাজু, সোলায়মান সুমন, সাঈদ অনাম, নূর সালমা, কুমার দীপ, সৈকত এম আরেফিন, সজল সমুদ্র, সুমন শামস, পিয়াস মজিদসহ সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং মননীল-জগতের নবীন-প্রবীণ অগণিত মানুষের সান্নিধ্য-সংস্পর্শ লাভের সুযোগ ঘটে।

নিজেকে যতদূর সম্ভব প্রস্তুত করেই লেখালেখির জগতে এসেছি। শূন্য দশকের শুরু থেকে রুদ্র, ধ্রুবসহ বিভিন্ন লিটলম্যাগ; দৈনিক সংবাদ, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সমকাল, দৈনিক কালের কণ্ঠসহ জাতীয় দৈনিকের সাহিত্যপাতা; মেঘবাহন, কালি ও কলম, পথরেখা, উত্তরণ, ফোকলোরসহ মাসিক নানাপত্রিকা এবং বিভিন্ন গবেষণা-জার্নালে নিয়মিত লিখে চলেছি।

এম আবদুল আলীমের গ্রন্থরাজির কয়েকটি

বাংলা একাডেমিসহ বিভিন্ন অভিজাত প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠান থেকে যেমন ত্রিশের মতো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য পত্রিকা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যিকী, আইবিএস জার্নাল, বাংলা একাডেমি পত্রিকা, উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন পত্রিকায় অনেক গবেষণা-প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকা সম্পাদনার অভিজ্ঞতা প্রথম হয় ২০০৩ সালের ১৫ আগস্ট; এবং সেটা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের মুখপত্র কৃষ্ণপ্রহর সম্পাদার মাধ্যমে। পরে কালবৈশাখী, রুদ্র, উদ্ভাবন, সাহিত্য গবেষণাপত্র, প্রভাতফেরি, সাঁথিয়ার কণ্ঠ, গৌরীগ্রাম বার্তা প্রভৃতি পত্রিকা সম্পাদনা করেছি। সাহিত্যের ছাত্র এবং শিক্ষক হলেও আমার ঝোঁক ইতিহাস-ঐতিহ্য-দর্শনের দিকে; বিশেষ করে বাঙালির জাতীয় জীবনের গৌরবময় অধ্যায় ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও সংগ্রাম আমার গবেষণাণার কেন্দ্রবিন্দু।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, বন্দে আলী মিয়া, শহীদ কাদরী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এম এ ওয়াদুদ, তাজউদ্দীন আহমদ, অনিসুজ্জামান প্রমুখকে নিয়ে আলাদা আলাদা গ্রন্থ রচনা করেছি। এখন মগ্ন থাকি বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় সন্ধান তথা ঘরে ফেরার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ঘটনা রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস-অনুসন্ধানে। হাতে নিয়েছি ভাষা-আন্দোলন-কোষ রচনার দুরূহ কাজ, যার প্রথম খ- প্রকাশিত হয়েছে ২০২০ সালে। বঙ্গবন্ধু ও ভাষা-আন্দোলন, আওয়ামী লীগ ও ভাষা আন্দোলন, ছাত্রলীগ ও ভাষা-আন্দোলন, পাবনায় ভাষা-আন্দোলন, সিরাজগঞ্জে ভাষা-আন্দোলন নামে গ্রন্থ যেমন রচনা করেছি; তেমনি রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন : জেলাভিত্তিক ইতিহাস নামে সহস্রাধিক পৃষ্ঠার বৃহৎ-কলেবর গ্রন্থ রচনা করেছি। পাবনায় ভাষা-আন্দোলন গ্রন্থের জন্য ২০১৪ সালে লাভ করি ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার’। এর চেয়েও বড় কথা প্রকাশক-সমালোচক এবং পাঠকের ভালোবাসা পেয়েছি বিস্তর। ওসমান গনি, জসিম উদ্দিনের মতো প্রকাশকের আনুকূল্য পাওয়া আমার জন্য পরম সৌভাগ্য বৈকি।

অনিসুজ্জামান, হাসান আজিজুল হক, আবদুল খালেক, শামসুজ্জামান খান, আহমদ রফিক, কামাল লোহানী, আবু তাহের মজুমদারের মতো বিগদ্ধজনের মূল্যায়ন আমাকে পঠন-পাঠন ও লেখালেখিতে গভীর মনোযোগী ও দায়বদ্ধ হতে প্রেরণা যুগিয়েছে। আমার ত্রিশোত্তর বাংলা কাব্যে বিচ্ছিন্নতার রূপায়ণ গ্রন্থ পাঠ করে হাসান আজিজুল হক লিখেছিলেন, ‘মনোনিবেশ কতটা একাগ্র ও মনোমুগ্ধকারী হলে এমন একটি গ্রন্থ রচনা করা যায়, আমি তা কল্পনা করতে পারি না। অনেকেরই তৃতীয় নয়ন খুলে দেবে এই বইটি।’ ভাষা-আন্দোলন-কোষ সম্পর্কে মূল্যায়ন করে আহমদ রফিক লিখেছেন : ‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ নামক ধ্রুপদী চরিত্রের গ্রন্থ রচনা করে ড. এম আবদুল আলীম কেবল ভাষাসংগ্রামীদের কাছেই নয়, বাঙালি মাত্র সকলের কাছেই ধন্যবাদার্য হয়ে রইলেন।’ একজন লেখক ও গবেষকের জন্যে এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কিছু হতে পারে না। আজীবন পঠন-পাঠন এবং লেখালেখিতে মগ্ন থাকতে চাই; পড়া পড়া পড়া এবং লেখার মধ্যেই খুঁজতে চাই মানবজন্মের পরম প্রাপ্তি এবং চরম সার্থকতা!

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের হাত থেকে ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার’ গ্রহণ করছেন ড. এম আবদুল আলীম
আমাদের সুজানগর : আপনি তো অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত আছেন প্রায় দেড় যুগ। এই পেশায় কি আপনার সন্তুষ্টি আছে? মানে, আমি বলতে চাইছি আপনি কি ইচ্ছা করে এই পেশায় এসেছেন? না কি জীবিকার দায়ে? শিক্ষক হিসেবে আপনার দায়বদ্ধতা এবং এ কালের শিক্ষকসমাজ সমাজের অগ্রগতিতে কী ভূমিকা পালন করছে আর সামাজিক অবক্ষয় ও অধঃপতনেই বা কতটুকু দায়ী?

এম আবদুল আলীম : শুরু করেছিলাম উল্লাপাড়া বিজ্ঞান কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে, সেটা ২০০৪ সালের কথা। অতঃপর এডওয়ার্ড কলেজ ঢাকা কলেজ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে কাটিয়ে দিলাম প্রায় দেড় যুগ। সারাজীবন ছাত্র হতে চেয়ে আমি শিক্ষকতায় এসেছি। পড়ি, পড়াই, প্রতিনিয়ত শিখি; বই থেকে, প্রকৃতি মানুষ ও সমাজ থেকে এবং আমার ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে। কিছু সমস্যা সত্ত্বেও পেশায় অমি সন্তুষ্ট। ইচ্ছা করেই আমি এ পেশায় এসেছি। জীবিকার একটা ব্যাপার তো আছেই। এর বাইরে জীবনকে শিক্ষার আলোয় দীপ্ত রাখতে এ পেশায় এসেছি, থাকবো আজীবন। শিক্ষক হিসেবে আমার দায়বদ্ধতা আমার ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে, দেশের কাছে, সমাজের কাছে। দেশ থেকে অনেক নিয়েছি, বাকী জীবন শুধু দিতে চাই, নিজেকে উজাড় করে; জ্ঞানের ভাঁড়ারের যা আছে, তার সবটুকু। এ কালের শিক্ষক সমাজ সমাজের অগ্রগতিকে বিশেষভাবে অবদান রাখছে। লেখা-পড়া শেষে যারা কর্মে নিযুক্ত হচ্ছে, তারা কোনো না কোনো শিক্ষককে ছাত্র বা ছাত্রী। ফলে সমাজের ইতিবাচক অগ্রগতি এবং নেতিবাচক নানান বিষয়ে শিক্ষকদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

আমাদের সুজানগর : ধর্ম, সমাজ এবং রাজনীতি সম্পর্কে আপনার উপলব্ধি কী? ধর্মান্ধতাকে আপনি কীভাবে দেখেন? এটা কি সমাজের অগ্রগতির পথে অন্তরায়? সমাজের সেই সুস্থির বন্ধন কি আছে? আমাদের দেশের বর্তমান রাজনীতির গতি-প্রকৃতি সে সম্পর্কে আপনার মল্যায়ন কী?

এম আবদুল আলীম : এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষ যে বর্মের নিচে নিজেদের নিরাপদ মনে করে সেটি হলো ধর্ম। আমি নিজে ধর্মনিষ্ঠ মানুষ। মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করে যে ধর্মীয় আচার, রীতি-নীতি, বিশ্বাস-সংস্কারের চর্চা ও পরিচর্যা দেখে আসছি তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই আমার। আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি আল্লাহ আমার রব, হযরত মোহাম্মদ (স.) আমার পথপ্রদর্শক। তবে আমি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি পছন্দ করি না। ধর্মের নামে মানুষ খুন, এবং ধর্মান্ধতার নামে সমাজকে পেছনে ঠেলারও আমি ঘোরবিরোধী। সাম্প্রদায়িকতাকে আমি জীবনের বড় শত্রু মনে করি। ধর্মান্ধতা অবশ্যই সমাজের অগ্রগতির পথে বড় বাধ। পুঁজিবাদী আগ্রাসন অনেক মূল্যবোধ, বিশ্বাস সংস্কারের মতো সমাজের বন্ধনও শিথিল করে দিয়েছে। ফলে সমাজের গতানুগতিক মূল্যবোধ এখন আর কাজ করছে না। তবে মানুষের সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করা দরকার। কারণ একাকী চলা মানুষের পক্ষ সম্ভব নয়।

স্ত্রী-পুত্র-সন্তানদের সঙ্গে ড. এম আবদুল আলীম

বর্তমানে আমাদের দেশের নানাকিছুর মতো রাজনীতিও অবক্ষয়ে ক্লিষ্ট। জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য আমাদের রাজনৈতিক সম্প্রীতি জরুরি। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়া এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বপ্ন আমি সবসময় দেখি। আমি ব্যক্তিগতভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মূল্যবোধ সম্পন্ন রাজনীতি পছন্দ করি। প্রত্যক্ষভাবে কোনো ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকলেও আমি প্রবলভাবে রাজনীতি-সচেতন, যা আমার লেখায় শুরু থেকেই প্রকাশিত হয়েছে। বাপ-দাদা যেভাবে এই বাংলাদেশকে গভীরভাবে ভালেবেসেছেন, এ দেশে জন্ম নিয়ে জীবন ধন্য মনে করেছেন, আমিও তাই মনে করি। এই দেশের রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার রাজনীতির বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন। আমি মনে করি, প্রতিটি মানুষেরই রাজনৈতিক আদর্শ থাকা উচিত; পরিস্থিতি বুঝে ভোল পাল্টানো এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

আমাদের সুজানগর : আপনার পরিবার সম্পর্কে জানতে চাই। জানতে চাই আপনার পূর্বপুরুষ, পিতা-মাতা, ভাই-বোন এবং সন্তানদের সম্পর্কে। যতদূর জানি, আপনি নিজের পছন্দে বিয়ে করেছেন; আরও স্পষ্ট করে বলি, আপনি সহপাঠীকে সহধর্মিণী বানিয়েছেন; কীভাবে দেখেন সংসারধর্মকে?

এম আবদুল আলীম : আমার দাদা কৃষক ছিলেন। তিনি নিজে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করলেও সন্তানদের প্রায় সকলকেই মাঝারি ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষত করে গেছেন। আমার পূর্ব পুরুষ, মানে প্রপিতামহ ছিলেন ঈশারত আলী মৃধা, পিতামহ আজাহার আলী মৃধা, পিতা আব্দুল কুদ্দুস, মাতা জাহানারা বেগম। পিতা ছিলেন পল্লিচিকিৎসক। আমরা ছয় ভাই-বোন; চার ভাই, দুই বোন; আমি দ্বিতীয়। আমার স্ত্রী বাংলা সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর; আমার সকল কাজের সহচর। পুত্র নির্ঝর, কন্যা নিষ্ঠা। হ্যাঁ, আমার সহধর্মিণী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী ছিলেন। খুব ভালো মানুষ। আমাকে এবং পরিবারের সদস্যদের পরমাত্মীয় জ্ঞান করে; আমিও।

পছন্দে ও বিয়েতে দায়টা নিজেদের তাই জবাবদিহিতা নিজের কাছেই থাকে। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ, মর্যাদাবোধ, ছাড় দেওয়ার মানসিকতা এবং বুঝতে পারার মধ্যেই দাম্পত্যজীবনের সার্থকতা নিহিত। আমি মনে করি সংসারধর্ম মানুষের জীবনকে পূর্ণতা দানের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সংসারবিরাগী মানুষেরা নিজের জীবন উৎসর্গ করে মানবের অশেষ কল্যাণ সাধন করেছে। আমি মনে করি সংসার-ধর্মে দীক্ষা নিয়ে তার মধ্যে ডুবেও জগতের জন্য করার আছে অনেক কিছু, আমি সেটাই করতে চাই।

আমাদের সুজানগর : আপনাকে ধন্যবাদ।

এম আবদুল আলীম : ধন্যবাদ ও শুভকামনা।

ঘুরে আসুন আমাদের ফেসবুক পেইজে

সাক্ষাৎকার: ড. এম আবদুল আলীম

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন। বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!