বীর-প্রতীক-আজিজুর-রহমান
কৃতি ব্যক্তিবর্গ,  বোনকোলা,  মানিকহাট,  মুক্তিযোদ্ধা

বীর প্রতীক আজিজুর রহমান

বীর প্রতীক আজিজুর রহমান (মৃত্যু: ১৯৯০ খ্রি.) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বীর প্রতীক খেতাব প্রদান করে। সুজানগর উপজেলার মধ্যে তিনিই একমাত্র খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। 

জন্ম: বীর প্রতীক আজিজুর রহমানের পৈতৃক বাড়ি পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার মানিকহাট ইউনিয়নের বোনকোলা গ্রামে। 

পারিবারিক জীবন: পিতার নাম আবদুল আলী মোল্লা এবং মায়ের নাম জাগিরননেছা। স্ত্রী  লুৎফা বেগম। তাদের তিন মেয়ে ও পাঁচ ছেলে।

কর্মজীবন: আজিজুর রহমান চাকরি করতেন ইপিআরে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে কর্মরত ছিলেন দিনাজপুর সেক্টরের ৯ নম্বর উইংয়ে (বর্তমানে ব্যাটালিয়ন)। তখন তাঁর পদবি ছিল হাবিলদার। প্রতিরোধযুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আরও পড়ুন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ বুলবুল

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর বীরগঞ্জ এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে তেঁতুলিয়ায় সমবেত হন। তেঁতুলিয়ায় তিনি কিছুদিন প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ৬ নম্বর সেক্টরের ভজনপুর সাব-সেক্টরে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন। অমরখানায় এক সেতু ধ্বংসের অপারেশনে তিনি আহত হন। সুস্থ হওয়ার পর আবার ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে।

তিনি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর, বর্তমানে বিজিবি) থেকে নায়েব সুবেদার হিসেবে অবসর নেন।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা: ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের জুন-জুলাই মাসে ভারত –বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার অন্তর্গত ময়নাগুড়ি, কামারপাড়া, বিলখাজুদ, ফকিরপাড়া, নয়াপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামসহ প্রায় সাত-আট মাইল এলাকাজুড়ে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়মিত টহল ও উপস্থিতি। কয়েক স্থানে ছিল তাদের পর্যবেক্ষণ পোস্ট। সেখানে পাকিস্তানি সেনারা সহযোগীদের নিয়ে অবস্থান করত।

আরও পড়ুন ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক প্রসাদ রায়

আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে মুক্তিবাহিনীর কয়েকটি দল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওই সব পর্যবেক্ষণ পোস্টে একযোগে আক্রমণ চালায়। আজিজুর রহমান এই আক্রমণে মুক্তিবাহিনীর একটি দলের নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি পোস্টে আক্রমণ চালিয়ে তাদের পিছু হটতে বাধ্য করার পর ওই সব এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে। দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা সামনের আরও এক মাইল এলাকা দখল করতে সক্ষম হন। এই এলাকার মধ্যে ছিল জাবরীদোয়ার, গোয়ালঝাড়, বানিয়াপাড়া, ডাঙ্গাপাড়া, বামনগাঁও, কামাদা, ভেলুকাপাড়া গ্রাম। আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে তাঁর সহযোদ্ধারা দখল করেন গোয়ালঝাড় গ্রাম। তারা ওই গ্রামে ক্যাম্প করে প্রতিরক্ষা অবস্থান নেন। বিরাট এলাকা, বিশেষ করে ভেলুকাপাড়া, গোয়ালঝাড় ও জাবরীদোয়ার হাতছাড়া হওয়ায় তা পুনরুদ্ধারের জন্য পাকিস্তানিরা মরিয়া হয়ে ওঠে। কয়েক দিন পর বিপুল শক্তি নিয়ে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানে আক্রমণ চালায়। তাদের আক্রমণে ভেলুকাপাড়া ও জাবরীদোয়ারে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।

আরও পড়ুন মুক্তিযুদ্ধের প্লাটুন কমাণ্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা খলিফা আশরাফ

আজিজুর রহমান সহযোদ্ধাদের নিয়ে বীরত্ব ও সাহসের সঙ্গে পাকিস্তানি আক্রমণ প্রতিরোধ করেন। তাদের পাল্টা আক্রমণে পাকিস্তানিদের অগ্রযাত্রা থেমে যায়। পাকিস্তানিরা ভেলুকাপাড়া ও জাবরীদোয়ার গ্রাম পুনর্দখল করতে সক্ষম হলেও গোয়ালঝাড় গ্রাম দখল করতে পারেনি। পাকিস্তানিরা গ্রাম দুটি দখল করার পর মুক্তিবাহিনীর ভজনপুর সাব-সেক্টর অধিনায়কের অনুরোধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর আর্টিলারি দল পাকিস্তানিদের ওপর বোমাবর্ষণ শুরু করে। এই সুযোগে সেখান থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধারা পুনরায় সংগঠিত হন। পরে তারা পাকিস্তানিদের পাল্টা আক্রমণ করেন। আর্টিলারি শেলিং ও মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন আক্রমণে পাকিস্তানিরা কাবু হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত পিছু হটে যায়। পরে পাকিস্তানিরা আরও কয়েকবার গোয়ালঝাড়ে আক্রমণ করে। আজিজুর রহমান প্রতিবারই সহযোদ্ধাদের নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তানি আক্রমণ প্রতিরোধ করেন। তাঁর দলের নিয়ন্ত্রণে থাকা গোয়ালঝাড় পাকিস্তানিরা আর কখনই দখল করতে পারেনি। দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত গোয়ালঝাড় গ্রামসহ পাশের বিরাট এলাকা মুক্ত ছিল। 

আরও পড়ুন বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন সন্টু

স্বীকৃতি: মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য আজিজুর রহমানকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ২০১। তিনি সুজানগর উপজেলার একমাত্র খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার পর স্থানীয় জনসাধারণ গোয়ালঝাড় গ্রামের নাম তাঁর নামে অর্থাৎ আজিজনগর নামে নামকরণ করে। গোয়ালঝাড় গ্রামের নাম এখনো আজিজনগর হিসেবে প্রচলিত আছে। 

এছাড়া এই বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্মানার্থে  ২০২০ সালে  সুজানগর উপজেলার হাটখালী ইউনিয়নের ‘জাংগল’ পাড়ার নাম আজিজনগর করা হয় এবং হাটখালী উত্তর পাড়া (জাঙ্গাল পাড়া) বাইতুল মিরাজ জামে মসজিদের নামকরণ করা হয়েছে আজিজনগর বাইতুল মিরাজ জামে মসজিদ।

মৃত্যু: বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

তথ্যসূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৩

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

বীর প্রতীক আজিজুর রহমান

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন। বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!