বিষফুল-শেষ-পর্ব
গল্প,  শফিক নহোর,  সাহিত্য

বিষফুল (শেষ পর্ব)

বিষফুল (শেষ পর্ব)

শফিক নহোর 

মুরাদকে যখন সে এত অবিশ্বাস করে, তাকে ডির্ভোস দিয়ে অন্য কোনো ছেলেকে বিয়ে করতে পারত।

সোনিয়া তা করেনি কেন? এ প্রশ্নের জবাব মুরাদ জানে না।

মুরাদ কি করত, কেন করত? তার সমস্ত জবাব দিতে হত সোনিয়ার নিকট। এটা ছিল মুরাদের সবচেয়ে অপছন্দের বিষয়।

এখন তো তাকে এসব প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য নয় মুরাদ। সে আলাদা থাকছে। তাদের সন্তানকে দেশেরে বাইরে রেখে পড়াশোনা করাতে হচ্ছে। এমন পরিবেশে বাচ্চা মানুষ হবে না ভেবে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিল। এই পরিবেশে থাকলে যা দেখবে তাই শিখবে। তখন বাচ্চাকে দোষ দিলে হবে না। এদিকে সংসার ঝুলে আছে বেগুন গাছে। নিজের দেশে কোনো কিছুর অভাব নেই। অথচ ছেলেকে দিল্লি রেখে পড়াশোনা করাতে হচ্ছে। সোনিয়ার যে বিরূপ আচরণ, তাতে ছেলেকে দেশে রাখার উপায় ছিল না।

সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই মণিকা কল দিয়ে বলল,

── গাজীপুর খুব সুন্দর একটা রিসোর্ট আছে যাবে আমার সঙ্গে?

মুরাদ সত্যিকার অর্থে অপ্রস্তুত ছিল। এমন অফার দেবে মণিকা। মুরাদ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর আবার প্রশ্ন করল,

── কী ব্যাপার ভয় পেয়ে গেলে না কি?’

── ভয় না ঠিক, সংশয়।

── কেন? বিশ্বাস করতে ভয় পাচ্ছো?

── যদি বলি, হ্যাঁ।

── অনলাইনে আছো?’

──জি।

── ভিডিও কল দেব?

── কেন নয়? নিশ্চয়ই। আজ খুব সেজেছি।

── তুমি ভয় পেলে যাবো না।

আরও পড়ুন গল্প দীপ্তিদের দেবতা

মণিকা ভিডিও কল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে অফ লাইনে চলে গেল। আগুনে ঘি ঢেলে দেবার মত অবস্থা।  মোবাইলে বার্তা দিয়ে ঠিকানাটা চেয়ে নিল মুরাদ।

এক ঘণ্টা পর তাদের দেখা হবে। অনেক দিনের জমানো ভালোবাসা মনোভাব তার নিজস্ব বহিঃপ্রকাশ হবে বৃষ্টির জলের মতো নিঃসঙ্গ।  কলমি লতার মতো নুয়ে পড়া শাড়ির আঁচাল বেয়ে জ্বলবে পুরোনো বেদনার ক্ষত। আকাশ ঘুরছে তার মাথার উপর। চোখের সামনে ভুলে যাবে, সত্যিই ভুলে যাবে আজ সোনিয়াকে।

── কী ভাবছো?

── না, কিছু না।

── আসতে দেরি হল। তাই একটু অন্যমনস্ক ছিলাম।

── চল, ভেতরে যাওয়া যাক।

মণিকা আজ সতেজ হয়ে উঠেছে; বৃষ্টি পাবার পর গাছেরপাতা যেমন সবুজ প্রাঞ্জল ঠিক তেমন।

── নাও, সিগারেট নাও।

বিদেশি ব্রান্ড দেখে মনে হঠাৎ প্রশ্ন চলে আসল মুরাদের।

── কবে গেলে বিদেশ?

── আমার কাজিন দিয়েছিল।

── ও আচ্ছা।

── কোন দিকে যাব বল?

── যেদিকে ইচ্ছে।

── অন্য কিছু চলবে?

──না।

── ক্লাবে যাবে বলেছিলে।

── তুমি কবে যাবে বল?

── যেদিন ইচ্ছে।

── রিসোর্ট ভারি সুন্দর।

── তোমার পছন্দ হয়েছে?

── হ্যাঁ, হয়েছে।

আরও পড়ুন গল্প সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা

সামনে পেছনে বাগান। বিদেশি ফুল, খেলার জায়গা। বসবার জায়গা বেশ দারুণ। তা ছাড়া নকশা করা চমৎকার লাগছে। ওয়েস্টার্ন মিউজিক বাজছে, ভারি মিষ্টি সে সুর।

──বাহিরে বসবে, না ভেতরে?

── বাহিরে বসি।

──বাহিরে বেশিক্ষণ বসা ঠিক হবে না।

── কেন?

── ঠাণ্ডা বাতাস, বৃষ্টি হচ্ছে। একটা রুম নেওয়া যেতে পারে কিছু সময় ভেতরে কাটালাম।

── বাহানা খুঁজছো,কাছে পাবার?

── তাতে দোষ কোথায়? ধরা দিতে ভয় হয়; না কি নিজেকে আড়াল করবার চেষ্টা।

── উজাড় করে দিতে চাইলেই যদি পালিয়ে যাও। তাই নিজেকে আড়াল করা খুব দরকার।

মণিকা বা দিকে চোখ তুলে দেখল দরজার উপরে লেখা ‘অ্যালকহোল কর্ণার’। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

── এখানে এসব পাওয়া যায়?

── সে কি!

── অভ্যেস আছে তো?’

── তা আছে।

── তবে আর কী?

── হয়ে যাক আজ।

অনেকদিন বসা হয়না।

── আমার সঙ্গে এতসব করছো। মন থেকে, না কি দু’দিন পর সব ভুলে যাবে?

── সব ভুলা যায়?

কিছুক্ষণ নিষ্পলক মুরাদের দিকে তাকিয়ে রইল। সময়, সবসময় সবার এক রকম থাকে না। নদীর ঢেউয়ের মতো পরিবর্তন হতে থাকে জীবন। এখানে মানিয়ে চলার চেয়ে মেনে চলা সহজ। সব আবেগ সবার হৃদয় ছুঁয়ে যেতে পারে না।

── কী খাবে?

── তুমি?

── তোমার পছন্দ বল।

── হুইস্কি।

──আমারও তাই।

‘চিয়ার্স…’।

── তোমাকে পাব মাঝেমধ্যে?

── মন থেকে চাইলে পাবে।

── তুমি হঠাৎ এভাবে আসবে, তা ভাবতেই পারিনি।

── আমিও না।

আরও পড়ুন গল্প  সময়ের পাঁচফোড়ন

ভাবছিলাম, আজকের সন্ধ্যেটা মাটি হয়ে যাবে। আজকের সন্ধ্যেটা অনেক দিন মনে রাখার মত। তোমার মতো অল্প বয়সী অপরুপা সুন্দরী আমার সঙ্গে বসে ড্রিংকস করছে,তা মনে রাখবার মতো নয় কি?

তা তো নিশ্চয়ই। চুলগুলো মৃদু বাতাসে উড়ছে। মণিকার চোখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে রইল মুরাদ। কিছুক্ষণ পর মাথার ভেতর একটা চক্কর দিল। সোনিয়ার মুখাবয়ব ভেসে উঠল মুরাদের চোখে। তখন সে চিৎকার করে উঠল।

──তুমি এখানে?

মণিকা মুরাদের মাথা তার বুকের সঙ্গে ঠেকিয়ে আলতো করে মাথায় হাত রেখে বলল,

── মনে হল বহুদিন পর ড্রিংকস করছো? বিশেষ কাউকে মনে পড়েছে বুঝি!

── ঠিক তা নয়। মাথাটা একটু ধরেছে।

পরের দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখল, সোনিয়া তার বিছানায় শুয়ে আছে পুরোনো ভঙ্গিমায়।

গাজীপুরের রিসোর্টের কথা ভুলে গেল বেমালুম। স্ত্রীর হাতের কোক পান করেই ড্রিংকস ফিলিংসে আক্রান্ত বেচারা!

সত্যিই সোনিয়া মুরাদের বিছানায় শুয়ে আছে। মুরাদ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

এই হয়তো প্রথম সোনিয়ার দিকে সে সত্যিকার দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়েছে। এত রূপ কখনো পরখ করে দেখনি।

কী ভুলে কীসের মায়ায় তাকে দূরে রেখেছিল, কীসের মোহ মায়ায় সোনিয়ার দিকে নিবিড় ভাবে তাকানোর সময় হয়নি মুরাদের?

পৃথিবীর উজান স্রোতে মুরাদ ভেসে গেছে চলতি নিয়মের ঠিক যেন বিপরীত। সংসার, অফিস, ব্যস্ততা চোরাবালির মতো একটা সময় দূরে যেতে থাকে বিবাহিত স্ত্রী। গা ভাসিয়ে দিয়েছিল ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে। কৈফিয়ত চাইবার অধিকার থাকলেও ব্যস্ততার খোলস মুরাদকে তার সামনে আসতে দেয়নি কখনো।

প্রযুক্তিগত ব্যস্ততা নিজেদের অহংবোধ ভেতরে একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেছিল। যে দেয়ালের জন্য পবিত্র হাসি দেখতে পায়নি, শুনতে পায়নি মধুময় কণ্ঠের সকালে চা পানের আকুতি। মণিকা খোলস বদল করেই সোনিয়া হয়েছিল।

‘মানুষ মূলত একটি প্রতিচ্ছায়া, তার নিজের ভেতরে নিজেই জমিয়ে রাখে অদৃশ্য বিষফুল।’

আরও পড়ুন গল্পের-
১ম পর্ব

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

বিষফুল (শেষ পর্ব)

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন। বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!