বইমেলা-ও-সরদার-জয়েনউদ্দীন
প্রবন্ধ,  সাহিত্য

বইমেলা ও সরদার জয়েনউদ্দীন

বইমেলা ও সরদার জয়েনউদ্দীন

সাহিত্যকৃতি ছাড়াও ইতিহাসে পাবনার সুজানগরের সন্তান সরদার জয়েনউদ্দীনের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বাংলাদেশের বইমেলার আন্দোলনের প্রবর্তক, পথ প্রদর্শক ও প্রধান সংগঠক হিসেবে। বইয়ের অসীম শক্তি যা মানুষের মেধা ও মননকে বিকশিত করে। সরদার জয়েনউদ্দীন যথার্থ উপলব্ধি করেছিলেন যে, দেশের মানুষ যত বই পড়বে দেশ ও জাতি তত উন্নত হবে।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান একটি নিবন্ধে (একুশে বইমেলার গোড়ার কথা, প্রথম আলো, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭) বাংলাদেশের বইমেলা প্রসঙ্গে যে বিবরণ দিয়েছেন, তা যেমন চমকপ্রদ তেমনি কৌতুহলোদ্দীপক। গত শতাব্দীর ষাট দশকের প্রথম দিকে সরদার জয়েনউদ্দীন বাংলা একাডেমি গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদে নিয়োজিত ছিলেন। তখন বাংলা একাডেমিতে প্রচুর বিদেশি বই সংগৃহীত হয়েছিল। এর মধ্যে একটি বই যার নাম ‘ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্ল্ড অব বুকস’ পড়তে গিয়ে দুটি শব্দ সরদার জয়েনউদ্দীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শব্দ দুটি হলো- ‘বুক’ এবং ‘ফেয়ার’ অর্থাৎ ‘গ্রন্থ’ এবং ‘মেলা’। বৈশাখীমেলা, লালনমেলা, বাউলমেলা, আরও কত মেলা আছে। এত কিছুর মেলা হয়, বইয়েরও যে মেলা হতে পারে, এ বইটি পড়েই তিনি প্রথম উপলব্ধি করেন।

এ সময় তিনি এমন একটি বিষয়ের সাথে যুক্ত হন যা মেলার ভাবনাকে আরও সামনে নিয়ে আসে। তখন তিনি ইউনিসেফের একটি প্রকল্পে যুক্ত হন। এটি ছিল শিশু-কিশোর গ্রন্থমালা উন্নয়ন প্রকল্প। শিশু-কিশোরদের জন্য এ প্রকল্পে অনেক বইয়ের সংগ্রহ হয়। এসব বই নিয়ে একটি প্রদর্শনীর কথা ভাবলেন। পরক্ষণেই মনে হলো, প্রদর্শনী কেন? বইমেলাই তো করা যায়। যেই ভাবনা, সেই কাজ। তিনি একটি শিশু বইমেলার আয়োজন করলেন। মেলাটি হলো আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির নিচতলায়। তখন এটি ছিল কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি। সম্ভবত এটিই এ জনপদের প্রথম বইমেলা। আর এ মেলাটি হয়েছিল ১৯৬৫ সালে।

আরও পড়ুন একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলি

শিশু গ্রন্থমেলা করে সরদার জয়েনউদ্দীন তৃপ্ত হতে পারেননি। আরও বড় আয়োজনের কথা ভাবলেন। সুযোগ খুঁজতে থাকেন। সুযোগটি পেয়েও যান। সহযোগিতায় এগিয়ে আসে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব। ১৯৭০ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জে বড় বইমেলার আয়োজন করেন। এ মেলায় আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই সময়ের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল হাই, শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিমসহ মান্যবর অনেকে।

মেলায় অনেক রকম বইয়ের পসরা ছিল। অনেক উৎসুক দর্শক এসেছিল। বইয়ের বেচাকেনাও ছিল ভালো। সবার আনন্দের জন্য সরদার জয়েনউদ্দীন একটি মজার বিষয় উপস্থাপন করেছিলেন। মেলায় একটি গরু বেঁধে রাখা হয়েছিল। তার গায়ে লেখা ছিল, ‘আমি বই পড়ি না।’ তার এই কৌতুক সবাইকে যথেষ্ট হাসির খোরাক দিয়েছিল। অনেককে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল। এখানেই তিনি থেমে থাকেননি। তার নিরন্তর পথ চলার যেন শেষ নেই। 

সরদার জয়েনউদ্দীন ন্যাশনাল বুক সেন্টার অব পাকিস্তানে রিসার্চ অফিসার হিসাবে যোগদানের পর সহকারী পরিচালক পদে থাকাকালীন বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। এই প্রতিষ্ঠানের নতুন নামকরণ করা হয় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনিই হলেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের প্রথম পরিচালক। মূলত জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে সরদার জয়েনউদ্দীনের কর্মজীবনের গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা।

আরও পড়ুন  ভাষা নিয়ে ভাবনা

এদিকে ১৯৭২ সালকে ইউনেস্কো ‘আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ কেন্দ্র করে সরদার জয়েনউদ্দীন এ উপলক্ষে ‘৭২ সালের ২০-২৬ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমিতে একটি আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন। বিশ্বের ১২টি দেশকে এই মেলায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। অস্ট্রেলিয়া, জিডিআর এবং আরও একটি দেশ শেষ পর্যন্ত এতে যোগ দেয়নি। কিন্তু ভারত, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন, জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বুলগেরিয়া প্রভৃতি দেশ মেলায় অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আমেরিকা সহযোগিতা না করায় ছাত্ররা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টলের নাম মুছে দিয়ে ভিয়েতনামটি যুক্ত করে দেয়। ফলে ভিয়েতনামও এই বইমেলায় অংশগ্রহণ করে। এ মেলার প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এবং সভাপতিত্ব করেছিলেন ড. মুহম্মদ এনামুল হক।

এই মেলায় ব্যবহৃত বিজ্ঞাপনটি ছিল ‘সবার জন্য বই’। স্বল্প পরিসরে মেলায় বইয়ের বিক্রেতা ও প্রকাশক হিসেবে অংশগ্রহণ করে মুক্তধারা প্রকাশনী, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স ও বর্ণ মিছিল। পরবর্তীকালে যুক্ত হয় নওরোজ কিতাবিস্তান, খান এ্যান্ড ব্রাদার্স, চট্টগ্রামের বইঘরসহ বাংলা বাজার ভিত্তিক বিভিন্ন পুস্তক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসমূহ। এভাবেই বাংলা একাডেমিতে বইমেলার সূচনা। যা ক্রমান্বয়ে আজ বৃহত্তর পরিসরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। কয়েকশ বই বিক্রেতা ও প্রকাশনা সংস্থার অংশগ্রহণে লেখক, প্রকাশক, পাঠক ও দেশ-বিদেশ থেকে আগত সাহিত্যানুরাগীদের মহামিলন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

১৯৭৩ সালে সরদার জয়েনউদ্দীন বর্তমান শিল্পকলা একাডেমির ভবনে একটি জাতীয় বইমেলার আয়োজন করেন এবং বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন জেলায় বইমেলার আয়োজন করেন। এতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন অভিনেতা ও আবৃত্তিশিল্পী গোলাম মুস্তাফা, হাসান ইমাম, হাসান আজিজুল হকসহ কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক ও বহু বুদ্ধিজীবী। অনেক জেলায় তিনি আয়োজন করেছিলেন বইমেলার। থানাগুলোতেও বইমেলা করার ইচ্ছা তাঁর ছিল। এভাবেই বাংলাদেশে বইমেলার একটি ভিত্তি তিনি তৈরি করে দিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন  আত্মকথন

সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কর্মকাণ্ডে এক নবতর প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। দেশ বিদেশে গ্রন্থমেলা আয়োজনের মাধ্যমে সরদার জয়েনউদ্দীন বাংলা ভাষা ও স্বদেশের গ্রন্থাবলিকে বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছাকাছি নিয়ে আসার এক অনন্য প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। সমগ্র বাংলাদেশে বই পড়ার অভ্যাসকে লোকপ্রিয় করার লক্ষ্যে প্রায় এককভাবে গড়ে তোলেন গ্রন্থমেলা আন্দোলন। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, রংপুর প্রভৃতি শহরে তাঁর সক্রিয় সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় গ্রন্থমেলা। মেলার সাফল্য লেখক, প্রকাশক ও পাঠক মহলে এক অভূতপূর্ব প্রেরণার সৃষ্টি করে।

বিশ্বে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, জ্ঞান চর্চা ও গ্রন্থের পরিচিতি সম্প্রসারণের জন্য সরদার জয়েনউদ্দীন জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে বিশ্ব গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণ করেন। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নেও তাঁর যাওয়া প্রায় ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠেনি। ১৯৭৮ সালে অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ ওএসডি হিসেবে তাঁকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। টেক্সটবুক বোর্ডে রাতারাতি এই বদলির কারণ তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জেনে যেতে পারেননি। কালের ধুলায় সরদার জয়েনউদ্দীনের নামটি আজ বিবর্ণ, বলতে গেলে বিস্মৃতপ্রায়। ইতিহাসের সত্য পাঠের প্রয়োজনে নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রন্থমেলা আন্দোলনে তাঁর অতুলনীয় অবদানের কথা তুলে ধরা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

আমৃত্যু সাহিত্যচর্চায় নিবেদিত, গ্রন্থমেলা আন্দোলনের নিরলস কর্মী সরদার ১৯৮৬ সালের ২২ ডিসেম্বর এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। সাহিত্যকর্মে অসাধারণ কৃতিত্ব এবং সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেছেন বিভিন্ন পুরস্কার-আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার, উত্তরা ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার। কিন্তু তাঁর কর্মবহুল জীবনে যে সর্বোত্তম পুরস্কারটি তিনি অর্জন করেন, সেটি হলো গ্রন্থপ্রেমী বিদগ্ধ পাঠক মহলের সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

বইমেলা ও সরদার জয়েনউদ্দীন

Facebook Comments Box

"আমাদের সুজানগর" পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলা ভিত্তিক একটি ওয়েব ম্যাগাজিন।

error: Content is protected !!