পাথরে-শৈবাল-খেলে
খলিফা আশরাফ (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

পাথরে শৈবাল খেলে

পাথরে শৈবাল খেলে

খলিফা আশরাফ

 

সিদ্দিকের সাথে দেখা হল বই মেলাতে। বিনতির ভার্সিটিমেট সে। কিন্তু বিনতি সেই সিদ্দিক আর এই সিদ্দিককে মেলাতে পারছে না কিছুতেই। এ যেন অন্য কোন সিদ্দিক। ক্লিন সেভ, জিন্স প্যান্টের সাথে লাল টি সার্ট, চোখে শোভন রিমলেস ফ্রেমের চশমা, ঘাড় অবধি ঝাঁকড়া চুল, একেবারে নিখুঁত পরিপাটি আধুনিক। দারুণ স্মার্ট। সাথে সুন্দরী এক শেতাঙ্গিনী। স্টলে স্টলে ঘুরে ঘুরে বই কিনছে। অথচ সে যখন ভার্সিটিতে ফিজিক্সে প্রথম ভর্তি হয়, তখন সবাই ওকে ‘ক্ষাত সিদ্দিক’ বলতো। ওর কথাবার্তা আচরণেও ছিলো প্রচুর গ্রাম্যতা। খুব ধার্মিক ছিল সিদ্দিক। পরকালে অবধারিত ফজিলতের জন্য জীবনে কোনদিন দাড়ি কাটেনি সে। সব সময় মাথায় টুপি থাকতো, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ছিলো অনিবার্য। আযান হলেই মসজিদে ছুটতো সে, ক্লাশ কিংবা লাইব্রেরী যেখানেই থাকুক। ওদের বাড়ি কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত থানা রৌমারীতে। বাবা মসজিদের ইমাম। কট্টর ধর্মীয় পরিমণ্ডলেই বেড়ে ওঠা তার। অক্ষর জ্ঞান শুরু কায়দা, আমপারা দিয়ে। তারপর কিছুদিন মাদ্রাসায়, পরে হাই স্কুলে। পুরো নাম মোহাম্মদ সিদ্দিক আলী সিকদার।

আরও পড়ুন গল্প হাইয়া আলাল ফালাহ

প্রথম প্রথম অনেকেই পাত্তা দিতো না সিদ্দিককে। ‘ক্ষাত’ বলে এড়িয়ে যেতো। ও সব তেমন গায়ে মাখতো না সে। লাইব্রেরী ছিলো তার পরম বন্ধু। ক্লাশ ছাড়া অবসর সময় সেখানেই কাটায় সে। তার তেমন কোন বন্ধু ছিলো না, অনেকটাই একা। কিন্তু ফার্স্ট ইয়ারেই মাত করলো সিদ্দিক। সবাইকে টপকে টপ স্কোর করলো সে। তখনই জানা গেলো মাধ্যমিক আর উচ্চ মাধ্যমিক দুটোতেই স্ট্যান্ড করা সে। বন্ধুত্বের তাড়া পরে গেলো। ভালো নোট পাবার আশায় অনেকেই যেচে গেলো তার কাছে। সাড়া দিলো সিদ্দিকও। বন্ধুর সংখ্যা স্ফীত হতে থাকলো। সবাইকেই যথাসম্ভব সহযোগিতা করতো সে। কিন্তু তার লেবাস, আচরণে একটুও পরিবর্তন হলনা। যথারীতি অনার্স আর মাস্টার্সেও প্রথম হল সে। কিছুদিনের মধ্যেই ‘ফুল স্কলারশীপ’ পেয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে আমেরিকায় চলে গেলো সিদ্দিক। তারপর আর দেশে ফিরেনি সে।
হঠাৎ বই মেলাতে পরিবর্তিত সিদ্দিককে দেখে একেবারে অবাক হয়ে গেলো বিনতি। এগিয়ে গেলো সে,
‘তুই সিদ্দিক না’?
ওর দিকে তাকিয়েই হেসে দিলো সিদ্দিক,
‘হাই বিনতি, তুই তো আগের মতোই আছিস। একটুও বদলাসনি’।
হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডসেক করলো সিদ্দিক, মোহাম্মদ সিদ্দিক আলী সিকদার। বিনতির দেখা এই প্রথম কোন মেয়ের সাথে হাত মেলালো সিদ্দিক। বিনতি অবাক চোখে বললো,
‘তুই কিন্তু অনেক বদলেছিস, একেবারে আপাদমস্তক’।
হাহা করে হাসলো সিদ্দিক। হাসতে হাসতেই বললো,
‘সবকিছুই পরিবর্তনশীল বিনতি। তুই তো ফিজিক্সের ছাত্রী, মেধাবী ছাত্রী, ভালো করেই জানিস, পৃথিবীর সব কিছুই প্রতিটি মুহূর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে। ফরাসী দার্শনিক বেগর্স কি বলেছেন মনে আছে? ‘গতি মানেই জীবন, যতি মানে মৃত্যু’। পরিবর্তনটাই তো স্বাভাবিক বিনতি’।

আরও পড়ুন প্রতীক্ষিত বৃষ্টি

আবার হোহো করে হাসলো সিদ্দিক। এই উদ্দাম হাসি আগের সিদ্দিকের সাথে একেবারেই সাজুয্যহীন। ওর হাসির শব্দে বই দেখা রেখে এগিয়ে এলো সেই শেতাঙ্গিনী। সিদ্দিক পরিচয় করিয়ে দিলো,
‘এ হচ্ছে ব্রিজিত, আমার গার্লফ্রেন্ড। ওর মা ফরাসি, বাবা আমেরিকান’। হাত বাড়িয়ে দিলো দিলো বিনতি,
Glad to meet you.
ওকে অবাক করে দিয়ে ব্রিজিত বললো,
‘আমি খুব খুশি হইচি। আমি বাংলা বলতে পারি, পড়তে পারি। ভালো লিখা হয় না, শিকতেচি। তুমি আমার সাথে বাংলা বলতে পারো’।
অবাক চোখে তাকিয়ে আছে বিনতি। সিদ্দিক জানালো, ব্রিজিত বাংলা ভাষার উপর পড়াশুনা করছে। সিদ্দিকের সাথে সবসময় বাংলাতেই কথা বলে সে। কোন বাঙ্গালী পেলে ওর উৎসাহ আরও বেড়ে যায়। ২১শে ফেব্রুয়ারীর ঘটনা সবিস্তর জানে সে। এর উপর ভালো পড়াশুনা আছে ওর। একুশের বই মেলার জন্যই ঢাকায় এসেছে সে। ব্রিজিত বললো,
‘তোমরা মহান জাতি । ভাষার জন্য বুকের রক্ত দিছো। World-এ আর কোন জাতি দেয় নাই। তোমাদের স্যালুট জানাই’। কপালে হাত ঠেকালো ব্রিজিত ।
‘আমি বাংলা ভাষা সাহিত্য পড়তাচি। খুব ভালো লাগতেচে। সিকদর আমারে অনেক কবিতা ‘recite’ করে শুনাইচে। বাংলা ভাষা খুব melodious, আমার কাচে খুব ভালো লাগে’।
‘তুমি আবৃত্তি করতে পারো না?’ জিজ্ঞাসা করে বিনতি ।
‘পারি, ভালো হয় না। আমি সব শব্দ ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারি না। শিখতেচি’।
‘তুমি কি আমাদের মুক্তি যুদ্ধের ইতিহাস জানো?’ আবার প্রশ্ন বিনতির।
‘জানি। আমি যখন বাংলা পড়তে শিখচি, তখনই তোমাদের মুক্তি যুদ্ধের অনেক বই পড়চি। সিকদর আমারে অনেক ঘটনা শুনাইচে। মাত্র ৯ মাসে তোমরা লাঠি হাতে পাকিস্তানিরে মারচো, দ্যাশ স্বাদিন করচো, whole world অবাক হইয়া গেচে। বাঙ্গালী বীর জাতি। তোমাদের great leader শেখ মুজিবকে আমি খুব ‘respect’ করি। তার মতো নেতা world-এ কম আছে। কিন্তু তোমরা তারে মাইরা ফেলচো, এইটা খুব খারাপ কাজ হইচে। আমি মনে দুঃখ পাইচি’।

আরও পড়ুন গল্প সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা

বিনতি অবাক হয়ে এক বিদেশিনীর বাঙালি প্রশস্তি শুনছিলো। মনে মনে খুব গর্ববোধ করছিলো সে। সাথে সাথে লজ্জা লাগছিলো নিজেদের অবিমৃষ্যকারিতার কথা স্মরণ করে। কি কৃতঘ্ন জাতি আমরা ! ক্ষমতার মোহে স্বাধীনতার স্বপ্নপুরুষকে আমরা নারকীয় উল্লাসে মেরে ফেলাছি। এতো রক্তের বিনিময়ে পাওয়া দেশটাকে আমরা লোভ আর লালসায় বাসের অযোগ্য করে তুলেছি। এখন যেন ‘চারিদিকে নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস’। সাধারণ মানুষ আজ অনাচারে জর্জরিত। মনটা বিষাদিত হয়ে উঠলো তার। ‘কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসা’? প্রসঙ্গ পাল্টালো বিনতি ।
‘কেমন লাগছে বইমেলা’?
‘আমার খুব ভালো লাগচে। আমিতো বই মেলার জন্য আইচি। অনেক বই কিনচি। আজও অনেক ভালো ভালো বই দেকচি। কিনবো। তোমরা আলাপ করো, আমি কিছু বই কিনে আনি’।
ব্রিজিত চলে গেলো বইয়ের স্টলে। বিনতি প্রশংসিত কণ্ঠে বললো,
‘মেয়েটা খুব ভালো। তুই কি ওকে বিয়ে করেছিস?’
‘না এখনো করিনি। ভাবছি শিগগিরই করবো। আমাদের একটা বেবী আছে’। খুব সহজ গলায় বললো সিদ্দিক।
বিনতি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এই কি সেই সিদ্দিক, যে কোনদিন নামাজ কাযা করেনি, দাঁড়িতে ব্লেড লাগায়নি, ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরে পা ফেলেনি, কোন মেয়েকে স্পর্শ করেনি। আজ সেই সিদ্দিক অবৈধ সন্তানের পিতা। সেটা আবার সহজে স্বীকারও করছে। একটুও গ্লানি নেই তার মধ্যে। মানুষ কতো দ্রুত বদলে যায়। কিন্তু এতোটা বদলায়? বিস্ময়ের ঘোর কাটে না বিনতির। সরাসরি প্রশ্ন করলো সে,
‘না বিয়ে করে তুই একটা মেয়ের সাথে থাকছিস, একটা বাচ্চা হয়েছে, তোর কাছে মনে হয় না এটা অধর্ম, পাপ?’

আরও পড়ুন গল্প জারজ

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সিদ্দিক বললো,
‘আমরা কি অন্য প্রসঙ্গে যেতে পারি’?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিনতি বললো,
‘সেই ভালো। তুই এক অবিশ্বাস্য বদলানো মানুষ। তো কোথায় উঠেছিস তুই?’
‘সোনার গাঁ হোটেলে। পরশু চলে যাবো’। উত্তর দিলো সিদ্দিক।
‘কেন, গ্রামের বাড়িতে যাবি না’?
‘মাথা খারাপ তোর? ব্রিজিতকে দেখলে, ওর সাথে না বিয়ে করে থাকা আর বেবীর কথা শুনলে আমার ইমাম বাপজান আমাকে একেবারে জবাই করে ফেলবে। কোরবানীর গরু কাটার বড় একটা ছোরা আছে বাপজানের’।
নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলো সিদ্দিক। কিন্তু বিনতি একটুও হাসলো না। কঠিন মুখে ঠোঁট চেপে বিড়বিড় করে সে বললো, ‘সেটাই তো করা উচিত’।
ততক্ষণে ব্যাগে একগাদা বই নিয়ে ব্রিজত চলে এসেছে। সিদ্দিক বিনতির দিকে ওর ‘নেইম কার্ড’ এগিয়ে দিয়ে বললো,
‘ফোন করিস’।
ব্রিজিতের গলা জড়িয়ে ধরে হাত তুলে ‘বাই’ বলে চলে গেলো ওরা। ঘৃণায় সিদ্দিকের কার্ডটা দুমড়ে মুচড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো বিনতি।

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

পাথরে শৈবাল খেলে

Facebook Comments Box

খলিফা আশরাফ জীবন ঘনিষ্ঠ একজন কবি ও গল্পকার। তাঁর লেখায় মূর্ত হয়ে ওঠে সমসাময়িক কাল, মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিকতার বিপর্যয় এবং মানুষের অভাবিত সার্থলোলুপতার ক্লিষ্ট চিত্র। তিনি বৈরী সময়কে গভীর ব্যঞ্জনায় অনুপম রূপায়ন করেন তাঁর লেখায়, সামাজিক অন্যায় অসঙ্গতি এবং নির্মমতার কারুণ্য ফুটিয়ে তোলেন অন্তর্গত তীক্ষ্ম অনুসন্ধিৎসায়। প্রকাশনা-কাব্যগ্রন্থ: বিপরীত করতলে, কালানলে অহর্নিশ, অস্তিত্বে লোবানের ঘ্রাণ; গল্পগ্রন্থ: বিল্লা রাজাকার ও সেই ছেলেটি, অগ্নিঝড়া একাত্তুর, একাত্তরের মোমেনা, পাথরে শৈবাল খেলে; ছড়াগ্ৰন্থ: ভুতুড়ে হাওয়া, কাটুশ-কুটুশ। তিনি  ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। 

error: Content is protected !!