পথভোলা-এক-পথিক-৩য়-পর্ব
এ কে আজাদ দুলাল (গল্প),  গল্প,  সাহিত্য

পথভোলা এক পথিক (৩য় পর্ব)

পথভোলা এক পথিক (৩য় পর্ব)

এ কে আজাদ দুলাল

 

শ্যামলীর সঙ্গে প্রতিদিন বাস স্টেশনে দেখা হচ্ছে, কথা হচ্ছে। ইদানিং লক্ষ্য করছি, আমাকে আরো কাছে পেতে চায় এবং বেশ কিছু সময় কাটাতে আগ্রহ দেখায়। ভাবলাম এভাবে চলতে দেয়া ঠিক হবে না। আবার হঠাৎ করে বন্ধও করা যাবে না। কৌশলে সব কিছু করতে হবে। কথায় আছে লাঠিও ভাঙবে, না সাপও মরবে। একটু সময় নিয়ে কথা বলতে হবে, তারপর মন্ত্র পড়তে হবে, যদি কাজে লাগে তো ভাল। আর যদি না হয়, পথ তো একটা ধরতেই হবে। এ নিয়ে কারো সাথে আলোচনা-পরামর্শ করার উপায় নেই। বাসা হতে সিদ্ধান্ত নিয়েই বের হলাম।

আজ বৃহস্পতিবার। শ্যামলী কোথায় অপেক্ষা করবে তা ভাল করেই জানা আছে। আবার অধ্যক্ষ স্যারের চোখে পড়েছি। অবিবাহিত মানুষের একা থাকার সম্ভাবনা খুব। ইচ্ছে থাকলেও বেশি দিন সম্ভবপর নয়। ইতোমধ্যে জীব বিজ্ঞান বিভাগে সবেমাত্র বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের একজন নতুন মহিলা প্রভাষক যোগদান করেছেন। দেখতে খারাপ না। বছর দু’য়েক ছোট হবে। গ্রামের সাধারণ ঘরের মেয়ে। বাবা হাই স্কুলের শিক্ষক। এ সবই অধ্যক্ষ স্যার আমাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন। পুরুষ হিসেবে আমি অবিবাহিত আর যাকে নিয়ে আলোচনা সে নতুন ম্যাডাম।

আরও পড়ুন গল্প প্রতীক্ষিত বৃষ্টি

মাথার ভেতর স্যারের কথাগুলো বেশ ক’দিন ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে। বুবুকে বলতে এক কথায় রাজি। বুবু রাজি হলে, বাবা-মা-ভাইবোন রাজি। আর আর এক ঝামেলা শ্যামলী নামের অপ্রাপ্ত বয়সের মেয়েকে নিয়ে। আঠার মতো লেগে আছে। মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে কলেজ ছুটির পর বের হলাম। যা ভাবছি ঠিক তাই। তিনি চাতক পাখির মত উদাস মনে দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে কলাপের অবাধ্য চুলগুলো দোল খাচ্ছে, সে দিকে তার খেয়াল নেই। কাছের মানুষের জন্য অপেক্ষা এ যেন মনের নতুন অনুভূতি। কিন্তু ও তো জানে না, কত বড় ভুল করতে যাচ্ছে। কাছে যেতেই, আমার দিকে চোখ পড়তেই চোখে-মুখে যেন স্বর্গীয় আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল। পশ্চিম আকাশে সূর্যের শেষ আলো তখনো ঝলমল করছে। শ্রাবণের শেষ প্রহরে ছিলো দিনটি।
__আপনার জন্য অনেক সময় ধরে অপেক্ষা করছি।
কথার ভেতরে বেশ অভিমানী সুর। নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,
__কলেজে অনেক কাজ ছিলো তাই।
__একটা কথা বললে রাখবে?
অতি উৎসাহ এবং আগ্রহ নিয়ে বললো,
__একটা কেন, হাজারটা বললেও শুনবো।
__তোমার পরীক্ষা আর কত মাস বাকী আছে?
নিচের দিকে কিছুটা সময় তাকিয়ে কি যেন ভেবে বললো,
__আর পাঁচ মাস। প্রি-টেস্ট, তারপর টেস্ট এবং ফাইনাল পরীক্ষা।
__বাহ! গুড গার্ল। তাহলে মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করতে হবে। এখন হতে মাসে তিনবার দেখা হবে। রাজি?
__রাজি। তবে….
__তবে আবার কী?
ব্যাগ থেকে খাতা বের করে বললো,
__বাংলা নোট তেরি করে দিতে হবে।
একটু চিন্তা করে বললাম,
__ঠিক আছে তোমার খাতা লাগবে না, বইও লাগবে না। আমার সব জানা আছে।

আরও পরুন গল্প পরাভূত

ভেবে দেখলাম খাতা নেওয়া মানে প্রেমপত্র লেখা। এই খাতার ভেতরে ওর মনের কথা লেখা নেই, কে হলফ করে বলতে পারে? তাছাড়া আমার ভাগনে সজল এসএসসি পরীক্ষার্থী। ওকে নোট তেরি করে দিয়েছি। ফটোকপি করে দিলেই চলবে। বিষয়টি মনের ভেতরে রেখে, ওকে সহানুভূতি দেখিয়ে, গাড়িতে ওঠিয়ে দিয়ে, ব্রিজের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে ভাবছি এরপর আর কি?

কলেজ আর বাসা। অন্যদিকে অধ্যক্ষ মহোদয়ের ভীষণ তাড়া। মতামত কেন দিচ্ছি না। তার কথা বিয়ে যখন করতেই হবে, দেরি কেন। সময়ের কাজ সময় মত করাই বুদ্ধিমানের কাজ। বিবাহিত মানুষের এই একটাই দোষ, অবিবাহিতদের পিছু লাগা। নতুন ম্যাডাম শাহানা নাসরিন আগের চেয়ে সহজ হয়েছেন কথা-বার্তায়, চাল-চলনে। তবে এ বয়সে কারো প্রেমে পরার সময় নয়। কথার মাধ্যমে একে অপরকে কিছু বুঝা যায়। এ সমাজে সবার বাবা-মার সংসারে টানাপোড়েন থাকে। বিশেষ করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির তো বটেই। আমার মত তারও ছোট একটা বোন রয়েছে। বাবাকে সাহায্য করতে হয়। বিয়ের পর যদি সম্ভব না হয় তখন বাবার জন্য কষ্ট হবে। এ কথা বলার একটা উদ্দেশ্য তো আছেই। মানে দাঁড়ায় আমাকে বিয়ে করলে এ সুযোগটা দিতে হবে। বিষয়টি বেশ ভাবনার। এ সব জেনে শুনে অধ্যক্ষ স্যারকে বিয়ের কথা বলতে হবে।

বড় বুবু-দুলাভাইকে বিস্তারিত বলাতে তাদের একটা কথা, আমাদের দেশে অভাবী সংসারে এটা হয়ে থাকে। আমার বড় বুবু তো আমাদের সংসারে সাহায্য করে থাকেন। সে তো দুলাভাইয়ের রোজকার। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কোন বিবাদ হয়নি। আসলে সব কিছু সাধারণ ভাবে দেখলে ঝড় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। শেষ পর্যন্ত সব জল্পনা কল্পনা শেষ করে আমাদের বিয়েটা সাদামাটা ভাবে সম্পন্ন হয়ে গেলো। বুবুর কথা আপাতত নতুন বাসা নেওয়ার দরকার নেই। দুজন আসি এক সঙ্গে, যাই আলাদা। ওর ক্লাস দুটোর মধ্যে শেষ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন গল্প সুরেন বাবু

বিবাহিত জীবন বেশ চলছে। শ্যামলীর কথা ভুলেই গেছি। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ। বিকেলে বেশ শীত পড়েছে। বৌয়ের দেওয়া স্যুট-টাই পরে কলেজে যাওয়া আসা করি। নিজেকে খুব স্মার্ট মনে হয়। পাঁচটার দিকে সূর্য মামা ক্লান্ত শরীরে ডুব দিতে চলেছে। এমনই একদিন বাসস্ট্যাণ্ডে শ্যামলী আমার অপেক্ষায়। চোখ পড়তেই বড় বড় চোখ মুখে বিজয়ী হাসি নিয়ে আমার সামনে হাজির। আমাকে দেখে অবাক। ভাবছি হয়ত জানতে চায় শ্বশুরের পোশাক কিনা। না তার কাছেও ঘেঁষলো না। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে পরীক্ষা শুরু তাই দোয়া নিতে এসেছে। প্রাণ ভরে দোয়া করে দিলাম। ঘুণাক্ষরেও বললাম না বিয়ে করেছি। এর পিছনে তো কারণ আছেই।

ওর মনজুড়ে হাফিজ আকাশ নামে জীবন সন্ধিক্ষণে এক পথিকের নাম মনের খাঁচায় বাসা বেঁধেছে। জানতে পারলে পরীক্ষার আগেই একটা জীবন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। পরীক্ষা শেষ হলেই বুঝিয়ে পথে আনা যাবে। মনের ভেতরে গভীর কষ্ট নিয়ে সেদিন বাসায় ফিরে ছিলাম। নিজেকে কেন যেন খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল। কিন্তু গোপন করা ছাড়া আর কোন উপায় আমার জানা ছিলো না। শ্যাামলী নামের মিষ্টি মেয়েটি গোপনেই থেকে গেলো। ঠাণ্ডা শরীরে আগুনের তাপ মনে হয় একটু দেরিতেই অনুভব হয়। এখন কেন যেন শ্যামলীর সেই দিন দূর্ঘটনায় জড়িয়ে ধরার অনুভূতির তাপ এখন একটু একটু করে অনুভব করছি। এই তাপ কি সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে? সংসার সাগর নামে অথৈই জলে ডুবে থাকবো, তখন হয়ত ভুলে যাব। হয়ত এভাবে কিছু দিন চলবে। কিন্তু অবুঝ শ্যামলী কি না পাওয়ার দহনে সারাজীবন জ্বলে মরবে? মনের ভেতরে ঝড় বয়ে গেল।

আরও পড়ুন পথভোলা এক পথিক-
১ম পর্ব
২য় পর্ব
শেষ পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

পথভোলা এক পথিক (৩য় পর্ব)

Facebook Comments Box

এ কে আজাদ দুলাল মূলত গল্প লেখেন। স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম লেখা 'বিল গণ্ডিহস্তী' প্রকাশ হয়। এরপর বিভিন্ন সাময়িক পত্রিকা ও মাসিক ম্যাগাজিনে কবিতা ও ছোটগল্প লিখে চলছেন। প্রকাশনা: বিবর্ণ সন্ধ্যা (২০২১ খ্রি.) লেখকের প্রথম গল্পগ্রন্থ। পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের নুরুদ্দীনপুর গ্রাম তাঁর পৈতৃক নিবাস ।

error: Content is protected !!