কৃতি ব্যক্তিবর্গ,  গোপালপুর (নাজিরগঞ্জ),  নাজিরগঞ্জ,  মুক্তিযোদ্ধা,  লেখক পরিচিতি,  সাহিত্য

খলিফা আশরাফ

খলিফা আশরাফ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসন ক্যাডারের একজন সাবেক কর্মকর্তা। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী, সম্মুখ সমরে যুদ্ধকালীন কমান্ডার। তিনি জীবন ঘনিষ্ঠ একজন কবি এবং গল্পকার।

জন্ম: খলিফা আশরাফ  ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ১লা জানুয়ারি পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। 

পারিবারিক জীবন: প্রাগ্রসর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বাবা মরহুম গোলাম হোসেন খলিফা আর কলকাতা পড়ুয়া মা আঞ্জুমান আরার উদার শাণিত প্রজ্ঞা, নৈয়ায়িকতা তাঁর মানসিক গঠনকে পুষ্ট, ঋদ্ধ এবং জীবনঘনিষ্ঠ করেছে। 

স্ত্রী সাঈদা আশরাফ একজন মহিলা উদ্যোক্তা, তার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘আঙ্গিনা’। তিনি বিভিন্ন নারী সংগঠন, মহিলা সমিতি, মাইডাস, ওমেন ওয়াচ বাংলাদেশ প্রভৃতি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো আয়োজিত বাণিজ্য মেলায় বিভিন্ন দেশ যেমন ইংল্যান্ড, ইতালি, আমেরিকা, চীন, মালয়েশিয়া, ভারত প্রভৃতি দেশ সফর করেছেন তিনি।

আরও পড়ুন  মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন

তাঁদের সংসারে তিন সন্তান, দুই ছেলে একটা মেয়ে। বড় মেয়ে সিনথিয়া আফরীন নোভা, ইংল্যান্ডে লেখাপড়ার সম্পন্ন করে সেখানেই বিবাহ করে স্থায়ী হয়েছে। বড় ছেলে সুমিত শাহরিয়ার, এআইইউবিতে বিবিএ শেষ বর্ষে পড়ার সময় ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে ২৩ বছর বয়সে এক দুর্ঘটনায় অকাল প্রয়াত। ছোট ছেলে সুজিত শাহরিয়ার, ইংল্যান্ড থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে দেশে ফিরে সামিট গ্রুপে চাকরিরত। তাঁর স্ত্রী ডাক্তার খাদিজা আলী লুপিন। জনাব খলিফা সপরিবারে মিরপুর ডিওএইচএস-এ বসবাস করেন।

শিক্ষা জীবন: তিনি বাল্যশিক্ষা গ্রহণ করেন কুষ্টিয়া জেলার জগতীতে (মাতুলালয়ে)। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন মহব্বতপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি নাজিরগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর রাজবাড়ী জেলা স্কুলে ভর্তি হন। সেখান থেকে মাধ্যমিক এবং রাজবাড়ী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক  সম্পন্ন করেন। অতঃপর  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  বাংলা  সাহিত্যে  স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। 

মুক্তিযুক্ত: খলিফা আশরাফ একজন সম্মুখ সমরের মুক্তিযোদ্ধা এবং প্লাটুন কমান্ডার। তিনি ‘ব্রেভো’ সেক্টরে তাঁর প্লাটুন নিয়ে অনেকগুলো সম্মুখ সমরে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছেন। তাঁর যুদ্ধক্ষেত্র ছিল রাজশাহী, রংপুর এবং বগুড়া অঞ্চল। মুক্তিযুদ্ধে তিনি তাঁর কয়েকজন সহযোদ্ধাকে হারান।

আরও পড়ুন সরদার জয়েনউদ্দীন

কর্ম জীবন: তিনি ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ব্যাংকার হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে বিসিএস করে  প্রশাসন ক্যাডারে ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদান করেন। মাঠ পর্যায়ে উপজেলা, জেলা এবং মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণান্তে এখন লেখালেখি নিয়েই সময় কাটান তিনি।

লেখালেখি: খলিফা আশরাফ ছাত্রাবস্থা থেকেই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। কলেজে পড়ার সময় তাঁর কবিতা কলেজ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। এ সময় তিনি একটি সাহিত্য সাময়িকীও সম্পাদনা করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাঁর বেশ কিছু কবিতা ভারতীয় সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। ইত্তেফাক, চট্টগ্রামের পূর্বকোণ, আজাদী ছাড়াও বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিকতার বিপন্নতা যেমন তাঁকে তাড়িত করে তেমনি একাত্তরের স্বপ্ন প্রত্যাশার বঞ্চনাও তাঁকে আলোড়িত, ক্ষুব্ধ করে। বিবেকের দায়বদ্ধতাই তার লেখনীর মূল অনুপ্রেরণা। 

প্রকাশনা:

 কাব্যগ্রন্থ:

  • বিপরীত করতলে (১৯৮৬ খ্রি.)
  • কালানলে অহর্নিশ (১৯৯১ খ্রি.)
  • অস্তিত্বে লোবানের ঘ্রাণ (২০২১ খ্রি.)

গল্পগ্রন্থ:

  • মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিত গল্পগ্রন্থ ‘বিল্লা রাজাকার ও সেই ছেলেটি (২০১৩ খ্রি.)
  • মুক্তযুদ্ধকালীন স্মৃতিবিজড়িত গল্প ‘অগ্নিঝড়া একাত্তুর (২০১৩ খ্রি.)
  • একাত্তরের মোমেনা (২০১৩ খ্রি.)
  • পাথরে শৈবাল খেলে (২০২১ খ্রি.)

ছড়াগ্ৰন্থ:

  • ভুতুড়ে হাওয়া (২০০১ খ্রি.)
  • কাটুশ-কুটুশ (২০০২ খ্রি.)
আরও পড়ুন আবদুল গনি হাজারী

জনাব খলিফা মূলত  কাল -চেতনাস্নাত জীবন ঘনিষ্ঠ লেখক। তাঁর লেখায় মূর্ত হয়ে ওঠে সমসাময়িক কাল, মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিকতার বিপর্যয় এবং মানুষের অভাবিত সার্থলোলুপতার ক্লিষ্ট চিত্র। তিনি বৈরী সময়কে গভীর ব্যঞ্জনায় অনুপম রূপায়ন করেন তাঁর লেখায়, সামাজিক অন্যায় অসঙ্গতি এবং নির্মমতার কারুণ্য ফুটিয়ে তোলেন অন্তর্গত তীক্ষ্ম অনুসন্ধিৎসায়।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অতুল বৈভব, একাত্তরের হিরান্ময় চেতনা যেমন তাঁর মনোজগতকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি একাত্তরের স্বপ্নচ্যুতি তাকে দারুণভাবে বিষাদিত করেছে। এই দ্বৈত দ্যোতনা তাঁর লেখায় অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে বাঙময় হয়ে ওঠে। তিনি আজও গভীর অভিনিবেশে প্রত্যাশিত সোনার বাংলা দেখার জন্য অনিমেষ চেয়ে থাকেন।

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

Facebook Comments Box

প্রকৌশলী মো. আলতাব হোসেন, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিবেদিত অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংগঠন "আমাদের সুজানগর"-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং "আমাদের সুজানগর" ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক। সুজানগর উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, কৃতি ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে ভালোবাসেন। বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি স্বনামধন্য ওয়াশিং প্লান্টের রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট সেকশনে কর্মরত আছেন। তিনি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত হাটখালী ইউনিয়নের সাগতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!