কুনমিংয়ের-বৃষ্টি-ও-শৈশবের-বৃষ্টিবিলাস
ইমরুল কায়েস,  ভ্রমণ কাহিনী,  সাহিত্য

কুনমিংয়ের বৃষ্টি ও শৈশবের বৃষ্টিবিলাস

কুনমিংয়ের বৃষ্টি ও শৈশবের বৃষ্টিবিলাস

লেখক-ইমরুল-কায়েস
লেখক ইমরুল কায়েস

কয়েকদিন হয়ে গেল সূর্যের দেখা নাই। কুনমিংয়ের আকাশটা মেঘলাই থাকে সারাক্ষণ। পরিবেশটা কেমন বিষন্ন। কিছুক্ষণ পর পর ঝুম ঝুম করে বৃষ্টি পড়ে। কখনো বেডরুমের, কখনো ড্রয়িংরুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখি। এটাকে জানালা বললে ভুল হবে। ড্রয়িং রুমের পশ্চিম পাশের পুরো একটা দেয়াল স্বচ্ছ কাঁচ দিয়ে তৈরি। কাঁচের দেয়ালে ছোট্ট একটা জানালা। মাঝেমাঝে খুলে দিলে বাইরের হাল্কা শীতল বাতাস ঘরে প্রবেশ করে। বেডরুমেরও একই অবস্থা। দক্ষিণ পাশের পুরো অর্ধেক দেয়াল স্বচ্ছ কাঁচের। এর একপাশে ছোট্ট একটা জানালা। দক্ষিণা জানালা। তবে বৃষ্টি দেখার জন্য দক্ষিণা জানালা খোলার দরকার পড়ে না। পর্দা সরালেই বাহিরটা দেখা যায়। রুমের ভেতর পড়াশোনা, পায়চারি করে সময় যায় না। কোয়ারেন্টাইন কালে রুমের সামনের করিডোরে যাওয়াও নিষেধ। তাই মাঝে মাঝে কাঁচের দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখি।

বাহিরে লোকজন খুব কম। যারা বের হয়েছেন সবার মাথায় ছাতা। শুধু বৃষ্টির সময় না। মেঘলা আকাশের কারণে এমনি সময়ও যারা রাস্তায় বের হন তাদের প্রায় সবার হাতে ছাতা থাকে। রাস্তায় নি:শব্দে গাড়ি চলে। কোন যানজট নাই। অতিরিক্ত কোন শব্দ নাই। একে অপরকে টেক্কা দিয়ে আগে যাবার তাড়া নাই। গাড়িঘোড়ার পাশাপাশি রাস্তাঘাটও পরিস্কার চকচকে। ঢাকার মত ফুটপাথ দখল করে থাকা চৌকি মার্কেট বা হকারদের দৌরাত্ম চোখে পড়ে না। রাস্তার দুপাশ দিয়ে সারি সারি সবুজ গাছ। গাছের পাতার ওপর পড়া বৃষ্টির পানি নিচে ঝরে পড়ে। এমনিতেই ধুলোবালি নেই। তারওপর বৃষ্টি। মনে হয় গাছপালা, ভবন, রাস্তাঘাট সবে গোসল সেড়ে উঠলো। একদম সতেজ। নি:শব্দ, শান্ত সতেজ শহরের সাথে যোগ হয়েছে প্রকৃতির বিষন্নতা। খানিকটা বিষন্ন আর গুমোট মনে হলেও কুনমিং তার সতেজতা হারায় না। সুউচ্চ ভবনগুলো দাঁড়িয়ে গগন বিদীর্ণ করে। ভবনগুলোর রং আমাদের দেশের মত এলোমেলো নয়। যেদিকে সাদা সেদিকে সব ভবনই সাদা। আবার যেদিকে অন্য রংয়ের সেদিকের সব ভবনই ওই রংয়ের।

আরও পড়ুন ভ্রমণকাহিনী ঘুরে এলাম পর্তুগাল

পশ্চিম পাশে সবুজ বনায়নে ঘেরা পাহাড় খুব বেশি দূরে নয়। পাহাড়ের নিচ দিয়ে টালি ছাদের দ্বোতলা তিনতলা সারি সারি বাড়ি। টালি ছাদগুলোর রং গাঢ় লাল। সারি সারি রক্তিম ছাদগুলো অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করে। বাড়িগুলো উঁচু জায়গায়। কমপক্ষে ২০ ফুট নিচ দিয়ে মূল রাস্তা। তবুও বৃষ্টির পানি রাস্তায় জমে না। কোথাও জলাবদ্ধতা দেখি না। এই রাস্তার অপর পাশেই ইয়ানতাই হোটেল যেখানে আমরা কোয়ারেন্টাইনে আছি।

বাড়ি

পশ্চিমদিকে কয়েকটি ভবন পরেই রাস্তাটি বিভক্ত হয়ে গেছে। রাস্তার এক অংশ গেছে নিচে ভূমির ওপর দিয়ে। অপর অংশ ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে। যতদুর চোখ যায় ফ্লাইওভারের রাস্তাটি পাহাড়ের কাছাকাছি গিয়ে বাঁক নিয়েছে। হয়তো সামনে পাহাড়ের কারণেই এই বাঁক। মনে হয় সবুজে ঘেরা কোন বনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে রাস্তাটি। বৃষ্টি থামলে মাঝে মাঝে মেঘেরা এসে খেলা করে সবুজ পাহাড়ের গায়ে। শুভ্র-সাদা চাদর বিছিয়ে দিয়ে মেঘেরা পাহাড়ের সাথে মিতালী করতে চায়। এই বৃষ্টি, পাহাড়, মেঘ মাঝেমাঝে মনকে উতলা করে তোলে। কিন্তু বের হওয়ার তো উপায় নেই। তাই বৃষ্টিস্নাত কল্পনার রাজ্যে ভেসে বেড়ায় মন।

শহুরে বৃষ্টি, বড়কালের বৃষ্টি দেখে খুব একটা লাভ নেই। বাহিরের এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে নষ্টালজিক হওয়া ছাড়া তেমন কিছু করার থাকে না। বড়জোড় বৃষ্টিকে একটু ছুঁয়ে দেখা যায়। চাইলেই বৃষ্টিতে ভেজা যায় না। বৃষ্টির সাথে খেলা করা যায় না। অথচ ছোট বেলা বা শৈশবে এই বৃষ্টি নিয়েই আমাদের রয়েছে কত শত স্মৃতি। শৈশবে বৃষ্টি হয়েছে, ভিজি নাই খেলাধুলা করি নাই, এমন কোন দিন হয়তো জীবনের খেরোখাতা খুললে পাওয়া যাবে না। শৈশবের বৃষ্টি বিলাস আমাদের সবারই আছে। বিশেষ করে যারা গ্রামে বড় হয়েছেন। বৃষ্টি হলে পাড়ার ছেলেছোকরার দল নিয়ে ছুটোছুটি, ধরাধরি, ফুটবল খেলাসহ দাপিয়ে বেড়াতাম আমরা। ফুটবল খেলা বললে কিঞ্চিৎ ভুল হবে। আসলে একগাদা খড় পেঁচিয়ে বলের আকার দিয়ে রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধতাম। তারপর সেটাকে ফুটবল মনে করে বৃষ্টির মধ্যে নেমে পড়তাম খেলতে। খেলা না বলে বরং সেই খড়স্তুপকে জটলা বেঁধে পা দিয়ে কাড়াকাড়ি বলাই ভাল।

আরও পড়ুন নেপোলিয়ন বোনাপার্টের দেশে

সাদা-বাড়িএকটু বড় হয়ে স্কুল কলেজে পড়ার সময় অবশ্য সত্যিকারের ফুটবল দিয়েই খেলা হত। বৃষ্টির মধ্যে ফুটবল খেলে যে কি আনন্দ পেতাম তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। পা পিছলে কেউ একজন আছাড় খেলে বাকীদের সেকি আনন্দ উল্লাস! বাবা-মায়ের শাসানি-বকুনী কোনকিছুই দমাতে পারে নাই আমাদের বৃষ্টি বিলাস থেকে। বর্ষার দিনে বৃষ্টি হলে তো কোন কথাই নেই। আমার এক ফুফাতো ভাই বয়সে একটু বড় আমাদের। খুব ছোটবেলায় ওর নেতৃত্বে বৃষ্টির দিনে বর্ষার পানিতে ধরাধরি লুকোচুরি খেলতাম আমরা।

বাড়ির পাশেই বর্ষায় অর্ধেক ডুবন্ত পাটের খেত, আমন ধানের আইলের মাঝে খেলতাম আর সারাদিন ভিজতাম। শেষে যখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে আসতো তখন পেটের টানে বাড়িতে ফিরে আসতে হত। কিন্তু বাড়িতে কি সহজে ঢুকতে পারতাম? মায়ের ভয়ে বাড়ির গেটের কাছে কতদিন কত সময় যে দাঁড়িয়ে থেকেছি তার ইয়ত্তা নেই। শেষে বাড়ির কাজের লোক দেখে অথবা মা নিজেই দেখে ভেতরে নিয়ে গেছেন আর বকুনি দিয়েছেন। মায়ের আশঙ্কাও অমূলক ছিল না। বৃষ্টিতে ভিজে শৈশবে কতবার যে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছি তা গুণে শেষ করা যাবে না। আর জ্বর হলে তো মায়েদেরই বেশি কষ্ট করতে হত। মাথায় পানি ঢালা, গা মুছে দেয়া, খাইয়ে দেয়া সব তাকেই করতে হত। তবুও এই শৈশবের যে আনন্দ ছিল তা বোধহয় এখন গ্রাম বাংলা থেকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন দুলাইয়ের জমিদার আজিম চৌধুরী

বৃষ্টি হলে পানিতে ভরে উঠতো আশপাশের খালবিল ডোবা। সেসব ডোবায় মাছ ধরা, ঝাঁপাঝাঁপি করা, রঙিন কাগজের ডিঙি নৌকা বানিয়ে পানিতে ভাসানোসহ কত কিছুই না করেছি। বৃষ্টির পর একটানা ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ কিংবা ঝিঁঝিঁ পোকার কর্ণকুহরের পর্দাছেনকারী ডাকে আমাদের শৈশবটা ছিল মুখর। ব্যাঙের ডাক শুনে সেজ মামা সিরাজুল ইসলাম গল্প জুড়ে দিতেন ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ নয় এভাবে, ব্যাঙেরা মিটিং করে। মিটিং চলাকালে ব্যাঙের সর্দার ফরমায়েশ দেয়, কর্মচারি ব্যাঙ সেটা পালন করে। অন্যরা কে কি বলে সেটা আশ্চর্য সুন্দরভাবে নিজের কণ্ঠের ওঠানামা করে বা স্বর চেঞ্জ করে ফুটিয়ে তুলতেন সেজ মামা। আমাদের শৈশব মন সরল বিশ্বাসেই আস্থা রাখতো মামার গল্পে। মনে হত তাইতো ব্যাঙেরা তো আসলে এভাবেই কথা বলছে। মামা যেভাবে যা বলতেন মনে হত একেকটা ব্যাঙ আসলে তাই বলছে। এরকম আরও কত স্মৃতি যে আছে তা বলে শেষ করা যাবে না। এখানকার কুনমিংয়ের শৈশব কি কাটে সেভাবে যেভাবে আমরা কাটাতাম বৃষ্টিতে ভিজে বৃষ্টি বিলাসে অথবা ব্যাঙের গল্প শুনে?

(লেখক বতর্মানে ফেলোশিপ করতে চীনে আছেন।)

আরও পড়ুন চীনের ডায়েরি-
১ম পর্ব
২য় পর্ব
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
৬ষ্ঠ পর্ব
৭ম পর্ব

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

কুনমিংয়ের বৃষ্টি ও শৈশবের বৃষ্টিবিলাস

Facebook Comments Box

সাংবাদিক ও লেখক ইমরুল কায়েসের পুরো নাম আবু হেনা ইমরুল কায়েস। মিডিয়া ও লেখালেখিতে ইমরুল কায়েস নামেই পরিচিত। প্রকাশনা: আনলাকি থারটিন অত:পর প্যারিস, রোহিঙ্গা গণহত্যা: কাঠগড়ায় সুচি, চায়না দর্শন, বিখ্যাতদের অজানা কথা; অনুবাদ গ্রন্থ: দ্য রুলস অফ লাইফ, দ্য লজ অফ হিউম্যান নেচার, দ্যা আইজ অফ ডার্কনেস। তিনি ১৯৮০ সালের ১৯ ডিসেম্বর পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত তাঁতীবন্দ ইউনিয়নের পারঘোড়াদহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!