নাইংল্যাখালী-বিল
আহম্মদপুর,  আহম্মদপুর ইউনিয়নের ইতিহাস ও ঐতিহ্য,  দ্বারিয়াপুর

ইতিহাস ঐতিহ্যে দ্বারিয়াপুর

ইতিহাস ঐতিহ্যে দ্বারিয়াপুর

~ আজিজুল কায়সার

 

দ্বারিয়াপুর গ্রাম পরিচিতি: পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত আহাম্মদপুর ইউনিয়নে অবস্থিত দ্বারিয়াপুর গ্রাম। পুরো গ্রামটি রয়েছে ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের দক্ষিণে গা ঘেঁষে। হযরত শাহ সুলতানের স্মৃতি বিজড়িত পূণ্যভূমি এই গ্রামের প্রাণকেন্দ্র হলো বাস স্ট্যান্ড, চৌরাস্তা মোড়। পাবনা থেকে দ্বারিয়াপুরে ঢুকতেই প্রথমে চোখে পড়বে মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা প্রদানকারী গ্রামীণ এবং রবি কম্পানির সুউচ্চ দুইটি টাওয়ার। একশত গজ সামনে ঈদগাহ ময়দান, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দ্বারিয়াপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও বিশাল খেলার মাঠ, ডান পাশে রয়েছে একটি মসজিদ।

গ্রামের ইতিহাস ও নামকরণ: উত্তরে আত্রাই নদী, দক্ষিণে গাজনার বিল সহ এই অঞ্চল ছিল এক সময় যমুনা নদীর সাথে সম্পৃক্ত বন জঙ্গলে ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পরিবেষ্টিত বিশাল এক দরিয়ার পাড়। যে জঙ্গলে এক সময় রয়েল বেঙ্গল টাইগার সহ বিভিন্ন জীব-জন্তুর আশ্রয়স্থল ছিল। আত্রাই নদীতে এক সময় হেলে দুলে চলতো বাহারী রংয়ের পাল তুলা নৌকা। মনোমুগ্ধকর নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকতো প্রতিটি বর্ষা মৌসুমে। লঞ্চ-ষ্টীমার চলাচলের কথাও শুনেছি কারো কারো মুখে। প্রয়াত এবং বয়স্ক লোকের মুখে শোনা যায়, সেই দরিয়া থেকেই দ্বারিয়াপুর নামের উৎপত্তি। ব্রিটিশ শাসনামলে যখন ডিএস রেকর্ড হয়, তখন ইংরেজি DARIAPUR শব্দটা মানচিত্রগতভাবে মৌজায় বাংলায় নামকরণ হয়ে যায় দ্বারিয়াপুর এবং সরকারিভাবে রেজিষ্ট্রি অফিসেও লিপিবদ্ধ করা হয়। সেই থেকে গ্রামের নামটি দরিয়াপুর এর পরিবর্তে দ্বারিয়াপুর হয়ে যায়।

অবস্থান: দ্বারিয়াপুর গ্রামের পূর্বে রয়েছে কাশিনাথপুর মিনি শহর। যা সাঁথিয়া, বেড়া, সুজানগর এবং আমিনপুর চার থানার মিলন কেন্দ্র। ২/৩ মিনিট হেঁটে চার থানার মৌজায় পা রাখা যায়। পশ্চিমে রয়েছে বিরাহিমপুর গ্রাম। উত্তরে আত্রাই নদী। নদীর ওপার ক্ষুদ্র গোপালপুর গ্রাম। দক্ষিণে রয়েছে নাইংল্যাখালি বিল। বন্যা মৌসুমে সেখানে স্থানীয় দর্শনার্থীদের উৎফুল্ল ভিড় লেগেই থাকে।

আরো পড়ুন বোনকোলা গ্রাম পরিচিতি

আয়তন ও জনসংখ্যা: প্রায় পাঁচ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই গ্রামে রয়েছে ছোট বড় মিলে প্রায় তিন হাজার লোকের বসবাস। দ্বারিয়াপুরের পশ্চিম অংশ এবং বিরাহিমপুরের পূর্ব অংশ মৌজাগত ভাবে বিরাহিমপুরের এলাকা হলেও তা মুলত দ্বারিয়াপুর নামেই পরিচিত। মধ্যবর্তী এই অংশের মানুষ (দ্বারিয়াপুর কিম্বা বিরাহিমপুর) নামের ক্ষেত্রে সুন্দর ও চিরস্থায়ী একটি সমাধানের জন্য উর্ধ্বতন মহলের কাছে বহুবছর ধরে প্রত্যাশা করে আসছে। এই গ্রাম ছয়টি পাড়ায় বিভক্ত-কাজীপাড়া, পুরান পাড়া, মধ্যপাড়া, মোল্লাপাড়া, স্কুল পাড়া এবং দোপপাড়া।

শিক্ষা ব্যবস্থা: তৎকালীন জরিপে শিক্ষাক্ষেত্রে পাবনা জেলার এই পূর্বাঞ্চলের ২/১টি গ্রামের মধ্যে দ্বারিয়াপুর গ্রামের সুনাম ছিল উল্লেখযোগ্য। এই গ্রামে আধুনিক শিক্ষার ছোঁয়া লেগেছে অনেক পূর্বেই। ১৯২৯ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার হার ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকে। ১৯৮৮ সালে মহিমান্বিত কিছু ব্যক্তির স্ব-উদ্যোগে এখানে একটি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। হাই স্কুলের রেজাল্ট সুজানগর উপজেলার মধ্যে তুলনামূলক ভাবে যথেষ্ট ভালো।

প্রতিষ্ঠানের তালিকা:
১. দ্বারিয়াপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (স্থাপিত: ১৯২৯ খ্রি.)
২. দ্বারিয়াপুর উচ্চ বিদ্যালয় (স্থাপিত: ১৯৮৮ খ্রি.)
৩. শহীদ ত্রিরত্ন ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংঘ (স্থাপিত: ১৯৩৮ খ্রি.)
১৯৩৮ সাল থেকে বুলবুল স্পোর্টিং ক্লাব নাম থাকলেও ১৯৭৪ সালের পর তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে ক্লাবটির নামকরণ করা হয় শহীদ ত্রিরত্ন ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংঘ। এটি এখন সরকারি রেজিষ্ট্রেশন প্রাপ্ত সমাজ উন্নয়নমূলক একটি প্রতিষ্ঠান।
৪. যাত্রিক পাঠাগার (স্থাপিত: ২০১৬ খ্রি.)
শিক্ষিত যুবকদের দ্বারা পরিচালিত একটি সমাজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। গ্রামের ছাত্রসমাজ এবং শিক্ষিত সচেতন ব্যক্তিবর্গ পাঠাগারে বই পড়ে সময় কাটান।

দ্বারিয়াপুর-উচ্চ-বিদ্যালয়
দ্বারিয়াপুর উচ্চ বিদ্যালয়

হাট-বাজার: এই গ্রামে কোন হাট-বাজার নেই। গ্রামের সকল জনগোষ্ঠী কাশিনাথপুর এবং বিরাহিমপুরে হাট-বাজার করে থাকে। তবে এখানে বেশকিছু দোকানপাট রয়েছে যা হাট-বাজারের মতোই জমজমাট থাকে সব সময়।

আরও পড়ুন বোয়ালিয়া গ্রাম পরিচিতি

যোগাযোগ ব্যবস্থা: পুরোটা গ্রামই ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত। মহাসড়ক থেকে গ্রামের মধ্যে নেমে গেছে চারটি পাকা রাস্তা। ঢাকার সঙ্গে এই অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক উন্নত। এখানে রয়েছে ঢাকা ও চট্রগ্রাম গামী সকল বাসের টিকেট কাউন্টার। কাজিরহাট আরিচা হয়ে কিংবা সিরাজগঞ্জ যমুনা সেতু হয়ে দুই দিক দিয়েই এখান থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে যাওয়ার পরিবহন পাওয়া যায় অতি সহজেই।

দ্বারিয়াপুর-প্রাথমিক-বিদ্যালয়
দ্বারিয়াপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়

দর্শনীয় স্থান: মহাসড়ক থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দক্ষিণে গ্রামটির শেষ প্রান্তে রয়েছে নাইংল্যাখালী বিল। চমৎকার দর্শনীয় একটি স্থান। কাজীপাড়ার ভিতর দিয়ে যে রাস্তাটি শাহ সুলতানের কবরস্থান ঘেঁষে চলে গেছে বিলের মাঝ বরাবর। নানাবিধ ফসলের সমাহার দেখে মন জুড়িয়ে যায়। বন্যা মৌসুমে হয়ে ওঠে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। মনে হয় যেনো মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলা ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছি। বিকেল থেকে সন্ধার পরও স্থানীয় দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে সেখানে।

স্মৃতিচারণ: দ্বারিয়াপুরকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেকের চোখে পানি চলে আসে। কেউ কেউ আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন অতীত স্মৃতিচারণে। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনামলে দ্বারিয়াপুরে একটি পুলিশ ফাঁড়ি ও একটি ডাকঘর ছিল, ক্রিসেন্ট ক্লাব নামে একটি ক্লাব ছিল। সেই ক্লাবের তত্ত্বাবধানে একটি পাঠাগারও ছিল। শোনা যায় সেই লাইব্রেরীতে কলকাতা থেকে পাঠানো মাসিক মোহাম্মদী, মাহে নও, মিল্লাত, সওগাত প্রভৃতি ম্যাগাজিন ও পত্রিকা সংরক্ষিত থাকতো। তবে ক্লাবের কোন স্থায়ী ভবন ছিল না। কাজী মোফাজ্জেল হোসেনের (দুলাল কাজীর পিতা)  বাড়িতে ঘরের একটি কক্ষই ছিল এই ক্লাব, আর আলমারি ছিল লাইব্রেরি। তার মৃত্যুর পর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই ঐতিহ্যগুলো গ্রাম থেকে বিলীন হয়ে গেছে।
কারো কারো স্মৃতিচারণে উঠে আসে স্বাধীনতা-পরবর্তী মর্মান্তিক, ও নৃশংস একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। তাদের বর্ণনা মতে স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করার মধ্য দিয়ে আলেকিত দ্বারিয়াপুরের গতি মন্থরের চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই নির্দয় এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা আজও কেউ ভুলতে পারেনি। যে কারণে রাজনৈতিকভাবে আজও উল্লেখযোগ্য কোনো নেতার জন্ম হয়নি এই গ্রামে।

আরো পড়ুন চরদুলাই গ্রাম পরিচিতি

সত্তরের দশকের বিশিষ্ট কবি ও প্রাবন্ধিক আব্দুল কুদ্দুস (লাল) মিয়া অপরূপ সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি, নদীনালা, খাল বিল, নানান রকমের পাখির কলতান, সৌন্দর্য বিস্তৃত ফসলের মাঠ ইত্যাদির অপরূপ সৌন্দর্যের বর্ণনা করতে গিয়ে তার জন্মভূমি দ্বারিয়াপুরকে নিয়ে কবিতার পঙ্তিমালায় অসাধারণ অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।

তোমার হাওয়া তোমার জলে
মিটিয়ে সকল ক্ষুধা,
প্রাণের চেয়ে প্রিয় আমার
জন্মভূমির সুধা।
তোমার ফসল তোমার ফলে
গান গাই তোমার
তোমার ছাড়া অন্য কোথাও
সুখতো নাহি পাই।
(‘জন্মভূমি’ কবিতাংশ)

আরেকজন বিশিষ্ট কবি ও কথাসাহিত্যিক তাহমিনা খাতুন তার জন্মভূমি দ্বারিয়াপুরের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, মায়া-মমতা আর আবেগের অনন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন তাঁর কবিতার মাধ্যমে।

তুমি আছো আজও মোর স্মৃতির পাতায়,
নানা রঙে ভরপুর।
ছোট নদী, খাল, বিল সবুজ প্রান্তর,
আজও ডাকে, দেয় হাতছানি, জুড়ায় অন্তর!
(‘আমার দ্বারিয়াপুর’ কবিতাংশ)

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান: এই গ্রামে রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় মসজিদসহ মোট আটটি মসজিদ। মাদ্রাসা না থাকলেও মসজিদে মক্তব চালু আছে এবং নিয়মিত কোরআনের শিক্ষা প্রদান করা হয়। কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানসহ এখানে রয়েছে মোট দুইটি ঈদগাহ ময়দান। রয়েছে কেন্দ্রীয় কবরস্থানসহ মোট দুইটি কবরস্থান।

দ্বারিয়াপুর-কেন্দ্রীয়-ঈদগাহ
দ্বারিয়াপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ

পেশা ও সামাজিক জীবন: আশির দশকেও গ্রামের প্রায় পঞ্চাশ ভাগ মানুষের পেশা ছিল কৃষি কাজ। বর্তমানে বেশিরভাগ মানুষই চাকরি এবং ব্যবসা পরিচালনা করে জীবন ধারণ করেন। বেশকিছু কৃষক আধুনিক কৃষিতে যথেষ্ট সফলতার মুখ দেখেছে। তাদের মধ্যে খোন্দকার আলতাফ হোসেন (শাহ সুলতানের উত্তরসূরি) ছিলেন দ্বারিয়াপুরের আধুনিক কৃষির জনক।
তার সফলতা দেখেই অন্যান্য কৃষকেরা আধুনিক কৃষি কাজে উদ্বুদ্ধ হয়। খোন্দকার আলতাফ হোসেন ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। আধুনিক কৃষকেরা পেয়ারা, বরই, আম্রপালি আমের বাগান করে পাবনা জেলার মধ্যে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছেন।

উল্লেখযোগ্য প্রয়াত ব্যক্তিবর্গ:
১. শাহ সুলতান: হযরত শাহজালাল (রঃ) যে ৩৬০ জন ধর্মপ্রচারক নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন সেই ধর্মপ্রচারকদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন হযরত শাহ সুলতান। যার বসতি, ঘর-সংসার ছিল এই দ্বারিয়াপুরে। তাঁর সমাধিও রয়েছে এই গ্রামে।

আরও পড়ুন বিল গাজনার ইতিহাস

২. হাজী শেখ নেয়ামত উল্লাহ: ১৮০০ সালে হাজী নেয়ামতুল্লাহ নামে একজন প্রভাবশালী ধর্মপ্রাণ বুজুর্গ ব্যক্তি ছিলেন এই গ্রামে। বর্তমানে তার উত্তরসূরিদের অনেকেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ ও সমাজের জন্য গুরুদায়িত্ব পালন করে চলছেন।

৩. জিন্নাতুন নেছা: কাজী মোফাক্কের হোসেনের স্ত্রী। এই মহিয়সী নারী জিন্নাতুননেসা ছিলেন তৎকালীন জমিদার। গ্রামের অসহায়, দুঃস্থ-দরিদ্র মানুষের একমাত্র আশা ভরসার আশ্রয়স্থল ছিলেন তিনি। অকাতরে সকলকেই ভালোবাসতেন তিনি।

৪. বাওন মৌলভী: বাংলাদেশের দক্ষিণবঙ্গের যশোর জেলার কোন এক গ্রামের হিন্দু ধর্মাবলম্বী সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ জমীদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। আনুমানিক ১৯৩০ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার মাধ্যমে তার নাম হয় মো. মহিউদ্দিন। পরিবারের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার কঠিন ব্রত নিয়ে বেরিয়ে পড়েন অজানা অচেনা স্থানে। ঘুরতে ঘুরতে আহাম্মদপুর গ্রামের প্রখ্যাত শামসুর রহমান মাওলানার (কালু মাওলানা) সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। তাঁর সান্নিধ্যে এসে ইসলামিক শিক্ষাচর্চায় অধিক শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বিশিষ্ট একজন আলেম। ইসলাম প্রচার এবং ওয়াজ মাহফিল করতে করতে কোন এক মারফতে তিনি এই দ্বারিয়াপুর গ্রামে এসে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং এখানেই ঘর সংসার ও বসতি স্থাপন করেন। মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব ঘোড়ায় চড়ে দূর-দূরান্তে কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিভিন্ন অঞ্চলে নিমন্ত্রিত আলেম হিসেবে ওয়াজ মাহফিলে যোগদান করতেন। মো. মহিউদ্দিন অত্র এলাকায় বাওন মৌলভী হিসেবেই বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।

৫. কাজী মোফাজ্জেল হোসেন: মরহুম দুলাল কাজীর পিতা কাজী মোফাজ্জেল হোসেন। তিনি একজন সমাজ সেবক ছিলেন। দ্বারিয়াপুরের শিক্ষা-সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে ক্রমাগত অনেক ঐতিহ্য এই গ্রাম থেকে হারিয়ে গেছে।
৬. কাজী সেকেন্দার হোসেন: কাজী সেকেন্দার হোসেন ছিলেন দ্বারিয়াপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। পঞ্চাশের দশকে মানুষ গড়ার হাতিয়ার হিসেবে দ্বারিয়াপুরের শিক্ষা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গৌরব উজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা হয় তার হাত ধরে। একজন আদর্শ শিক্ষক হিসাবে তার যথেষ্ট সুনাম এবং খ্যাতি ছিল অত্র এলাকায়।

আরও পড়ুন দুলাইয়ের জমিদার আজিম চৌধুরী

৭. শহীদ আতর, আসাদ ও হারেজ: শহীদ আতর, আসাদ ও হারেজ তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা হারেজের বাড়ি দ্বারিয়াপুর ছিল না। তিনি ছিলেন দ্বারিয়াপুরের জামাই। স্বাধীনতাযুদ্ধে সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করেছিলেন তিনজনই। তিনজনই ছিলেন যেনো এক আত্মার মানুষ, একে অপরের প্রাণ ভোমরা। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। শোনা যায় সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বন্ধুত্ব বিসর্জন দিয়ে তারা মৃত্যুর মুখ থেকে কেউ কাউকে ছেড়ে পালিয়ে যাননি। একসাথে জীবন দিয়েছেন তিনজনই।

৮. কাজী মাহবুব হোসেন: কাজী মাহবুব হোসেন ওরফে দুলাল কাজী ছিলেন একজন বিচক্ষণ সমাজ সেবক। গ্রামের প্রতি আজও তার অবদান সবার শীর্ষে।

৯. আবুল হাশেম: আবুল হাশেম ওরফে চুনু মিয়া গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য জায়গা দান করে সর্বপ্রথম মহানুভবতার নিদর্শন দেখিয়েছিলেন।

১০. খলিলুর রহমান: খলিলুর রহমান (খলিল ডাক্তার) একজন সমাজ সেবক, পরহেজগার ও মানবীয় গুণ সম্পন্ন একজন স্বহৃদয় মানুষ ছিলেন। দ্বারিয়াপুর কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রতিষ্ঠায় রয়েছে তার যথেষ্ট অবদান। গ্রাম্য ডাক্তার হিসেবে তার যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। বিনামূল্যে ঔষধ বিতরণসহ শুধুমাত্র দোয়া দরুদের মাধ্যমেও অত্র এলাকার অগণিত মানুষের রোগ সারিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় খলিল ডাক্তার।

১১. গোলজার হোসেন মোল্লা: মহাসড়কের পাশে দ্বারিয়াপুরের শুরুতেই মোল্লাপাড়া যার বাড়ি, তিনি ছিলেন প্রয়াত গোলজার হোসেন মোল্লা। পৈতৃক সূত্রে অনেক জমিজমার মালিক ছিলেন তিনি। পরিচ্ছন্ন ইমেজের একজন বিশিষ্ট পাট ব্যবসায়ী হিসেবে কাশিনাথপুরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব প্রয়াত নুরুজ্জামান সাহেব, বাবু ডিলার প্রমুখ খ্যাতিসম্পন্ন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ছিল তার ব্যবসা এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ধর্মপ্রাণ মরহুম গোলজার হোসেন ধর্ম প্রীতিতে উজ্জীবিত হয়ে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন দ্বারিয়াপুরের শুরুতেই মহাসড়কের পাশে একটি মসজিদ ঘর।

১২. খোন্দকার আবুল খায়ের: হযরত শাহ সুলতানের উত্তরসূরী আবুল খায়ের (খসরু মাস্টার) দ্বারিয়াপুর উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে কয়েকজন অগ্রগামীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম একজন। একই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি। মানবিক গুণ সম্পন্ন এবং আদর্শ শিক্ষক হিসেবে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন আমাদের দ্বারিয়াপুর গ্রাম

১৩. শেখ মোবারক হোসেন: হাজী নেয়ামতুল্লাহর উত্তরসূরিদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব। বিসিএস ক্যাডার শেখ মোবারক হোসেন বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের গ্লোরিয়াস অফিসার হিসেবে যথেষ্ট সম্মানের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। অবশেষে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্নসচিব থাকা অবস্থায় অবসর গ্রহণ করেন। দ্বারিয়াপুরের যুব সমাজকে নিয়ে তার মহৎ এবং সুচিন্তিত বৃহৎ পরিকল্পনা ছিল। তবে তিনি তা বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। ২০২০ সালের ১৮ মে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

১৪. আব্দুল কুদ্দুস মিয়া: আব্দুল কুদ্দুস মিয়ার ডাক নাম ছিল লাল ডাক্তার। দূর্গাপুর নেছারা খাতুন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক ছিলেন। তিনি অত্যন্ত সৎ ও আদর্শবান একজন জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক এবং সমাজসেবক। সত্তুরের দশক থেকেই প্রচুর লেখালেখির অভ্যাস ছিল তাঁর। তার লেখা বেশ কয়েকটি কবিতা, ছড়া ও ইসলামিক বই প্রকাশ হয়েছে। বাংলাদেশ বেতারে তার লেখা গানও বেশ কয়েকবার প্রচারিত হয়েছে। আব্দুল কুদ্দুস নেশায় কবি ছিলেন, পেশায় নন। তিনি বলতেন, “সাহিত্য হলো আত্মার অনুরণন-এটা জীবিকার জন্য নয়, জীবনের জন্য”। ২০২২ সালের ২৩ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

১৫. রফিকুল ইসলাম: রফিকুল ইসলাম (লেবু মাস্টার) দ্বারিয়াপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন আদর্শ শিক্ষক ছিলেন। প্রয়াত খলিল ডাক্তারের যোগ্য সন্তানদের মধ্যে তিনি একজন। মায়া মমতা এবং সৃজনশীল শিক্ষা প্রদানে তিনি ছিলেন নিবেদিত এবং একজন জনপ্রিয় শিক্ষাগুরু।

হযরত শাহ সুলতানের পদধূলিতে ধন্য ও পবিত্র এই ভূমিতে সম্মুখ সমরের মুক্তিযোদ্ধাসহ অসংখ্য গুণে গুণান্বিত এবং মহিমান্বিত ব্যক্তিত্বের জন্মভূমি এই দ্বারিয়াপুর গ্রাম। দেশের বাইরে থেকে ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জনকারী ব্যক্তিত্ব রয়েছেন বেশ কয়েকজন। বিসিএস ক্যাডারসহ এখানে রয়েছে ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, রয়েছে সচিব, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কবি, সাহিত্যিক, আইনজীবী, সাংবাদিক, স্কুল-কলেজে শিক্ষা প্রদানকারী শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে চাকুরীজীবী অসংখ্য সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তারা প্রত্যেকেই দ্বারিয়াপুরের প্রতি আদর্শিক প্রেম এবং কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ।

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

ইতিহাস ঐতিহ্যে দ্বারিয়াপুর

Facebook Comments Box

আজিজুল কায়সার ১৯৭৩ সালের ১১ নভেম্বর, পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার অন্তর্গত আহম্মদপুর ইউনিয়নের দ্বারিয়াপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!