অধ্যাপক-মোহাম্মদ-আব্দুল-2
কৃতি ব্যক্তিবর্গ,  গবেষক,  গোপালপুর (ভায়না),  বিজ্ঞানী,  ভায়না,  লেখক পরিচিতি,  শিক্ষাবিদ,  সাহিত্য

অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার (২য় পর্ব)

অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার (২য় পর্ব)

~ মোহাম্মদ আব্দুল মতিন

 

অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার সাতবাড়িয়া স্কুলে পড়ার সময়েই বন্ধুদের নিয়ে হাতে লেখা পত্রিকা বের করতেন। সেইখান থেকেই তিনি লেখার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এই সময়ে ঢাকার এক ভদ্রলোক, তাঁর একখানা বইয়ের সমালোচনা আহবান করে এক বিজ্ঞাপন দেন, তখনকার কোন এক সাপ্তাহিকে। সমালোচক হতে হবে স্কুল কলেজের ছাত্র এবং সমালোচনার জন্য দেওয়া হবে তিনটি পুরস্কার। অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার এই সমালোচনায় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় পুরস্কার পান। অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়া অবস্থাতেই আজাদ, মোহাম্মদী প্রভৃতি কাগজে ছোটদের জন্য বিজ্ঞান সম্বন্ধে লেখালিখি শুরু করেন। তাঁর অগ্রজ, বিজ্ঞানে মুসলমানের দান-এর লেখক মোহাম্মদ আকবর আলী সাহেবের উদ্যোগে, ১৯৫০-৬০ সাল পর্যন্ত ঢাকায় মাসিক ইমরোজ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের হত। এই পত্রিকাতে তিনি ‘মিন্টুর ডাইরি’ শীর্ষক এক শিশুতোষ রম্যরচনা লিখতেন। এই রম্য রচনাটি শিশুদের এবং বড়দের ভেতর সমান জনপ্রিয় ছিল।

মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার সাতবাড়িয়া উচ্চ ইংরেজি স্কুল থেকে লেটারসহ ম্যাট্রিক পাশ করে বৃত্তি পান। তিনি সরাসরি প্রেসিডেন্সী কলেজে আইএসসি পড়েন এবং ১৯৩৪ সালে ভালো ফলাফলসহ আইএসসি পাশ করেন। সে বছর আইএসসি পরীক্ষায় মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। ভালো ফলাফলের জন্য এবারেও তিনি বৃত্তি পান ।

আরও পড়ুন আব্দুল গণি হাজারী

উনার অগ্রজ, মোহাম্মদ আকবর আলী ১৯৩৩ সালে কেমিস্ট্রিতে প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় হয়ে এমএসসি পাশ করেন। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক ড. কুদরত-ই-খুদার স্নেহভাজন ছাত্র ছিলেন। ড. কুদরত-ই-খুদা ছিলেন তখন প্রেসিডেন্সি কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং প্রধান। আইএসসি-তে তাঁর (অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার) আশা ছিল কেমিস্ট্রিতে লেটার পাবেন এবং কেমিস্ট্রিতে অনার্স পড়বেন। কিন্তু তিনি তাঁর প্রত্যাশিত/কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে লেটার না পেয়ে পেলেন অংকে (অবশ্যই বিষয়টি আমাদের জন্য সৌভাগ্যই বলতে হবে)। তখন ড. কুদরত-ই-খুদার পরামর্শে তিনি অংকে অনার্স নিয়ে বিএসসি-তে ভর্তি হলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি বিএসসি (অনার্স) পাশ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসসি ভর্তি হলেন। এখানে, নব নিযুক্ত জার্মান অধ্যাপক প্রফেসর লেভী এম এসসি কোর্সে পিওর ম্যাথামেটিকস নামে একটা নতুন সাবজেক্ট প্রবর্তন করেন। প্রফেসার লেভী এই বিষয়ের জন্য মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার-কে নির্বাচিত করেন। মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে ১৯৩৮ সালে এমএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ছিলেন অংকে প্রথম হওয়া মুসলমান ছাত্র।

প্রফেসর-লেভীর-সাথে-মোহাম্মদ-আব্দুল-জব্বার
প্রফেসর লেভীর সাথে মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার (বাম পাশে দাঁড়িয়ে)

আব্দুল জব্বার কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ স্কলারশীপ নিয়ে প্রফেসর লেভীর অধীনে গবেষণা শুরু করেন। সেকালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাইপজ (Tripose) ডিগ্রির বেশ নামডাক ছিল। তিনটি বিষয়ে অনার্স ডিগ্রি লাভ করা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়। তাই যাঁরাই ট্রাইপজ হয়েছিলেন সমাজে ও দেশে তাঁদের খুবই সুখ্যাতি হতো। মোহাম্মদ আব্দুল জব্বারের আত্মীয়-স্বজন ও শুভানুধায়ীরা অনেকেই চেয়েছিলেন যে, তিনিও ট্রাইপজ ডিগ্রির জন্য পড়বেন। কিন্তু তাঁর শিক্ষক প্রফেসর লেভি বাদ সাধলেন। তিনি বললেন, ট্রাইপজ-তো অনার্স ডিগ্রি, তুমি তা করবে কেন ? তুমি ডিএসসি করে আসবে।

আরও পড়ুন অশোক কুমার বাগচী

মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার তাঁর নিঃস্বার্থ শুভানুধ্যায়ী প্রফেসর লেভির পরামর্শ গ্রহণ করে ডিএসসি ডিগ্রির লক্ষ্যে ফরেন স্কলারশিপ নিয়ে, ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিলেতের উদ্দেশ্যে বোম্বাই-এ জাহাজে উঠলেন। ইতোমধ্যে ইউরোপে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। জাহাজ ছাড়ার দুই দিন পরই ব্রিটেন হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। জার্মান যুদ্ধজাহাজের অতর্কিত আক্রমণের আশঙ্কায় তাঁদের জাহাজ সুয়েজ খাল দিয়ে না যেয়ে পুরা আফ্রিকা ঘুরে প্রায় দেড় মাস পর ব্রিটেনে পৌঁছায়। খাবার পানির তীব্র অভাব দেখা দেওয়ায় চালু হল পানির রেশন। প্রত্যেক যাত্রীর জন্য সারাদিনে বরাদ্দ ছিল মাত্র এক গ্লাস পানি। দেড় মাস পর প্রফেসর লেভীর সুপারিশ অনুযায়ী তিনি (ডিএসসি করার উদ্দেশ্যে) কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যলয়ে এমএসসি-তে ভর্তি হলেন।

এদিকে যুদ্ধের ঘনঘটা বেড়েই চলছে এবং বিলেতের সব সক্ষম লোকদের বাধ্যতামূলক ভাবে সৈন্যদলে ভর্তি করা হচ্ছে। নানান প্রতিকূলতার ভেতর তাঁকে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে হচ্ছিল। এই অবস্থায় এক বছর গবেষণার পর তিনি পিএইচডি ডিগ্রির জন্য মনোনীত হলেন। টিউটর প্রফেসর তাঁর এমএসসি ডিগ্রি সম্বন্ধে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও কোর্স সম্পূর্ণ করার পূর্বেই প্রফেসর সৈন্যদলে যোগ দিতে বাধ্য হন। বিদেশীরা অতি সহজেই শত্রুর স্পাই হিসাবে কাজ করতে পারে এই ভয়ে, ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের এক আদেশে সমস্ত বিদেশীদের ইংল্যান্ড ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করে। অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার-কেও ফিরে আসতে হলো।

কেম্ব্রীজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে-অধ্যায়নকালে
কেম্ব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালে ; কেম্ব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্ক বিভাগ (বর্তমানে)

উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ গমনের পূর্বেই মোহাম্মদ আব্দুল জব্বারের বিবাহ সুসম্পন্ন হয়েছিল। বিলেতে যাবার কথা উঠতেই তাঁর আব্বা ও আম্মা তাঁর বিয়ে দিতে চাইলে তিনিও অমত করলেন না। অতঃপর ১৯৩৯ সালে ৮ই জুন সুপ্রসিদ্ধ সুসাহিত্যিক মোহাম্মাদ বরকতুল্লাহ সাহেবের বড় মেয়ে, কলকাতার সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী, বেগম নূরজাহানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয়।

আরও পড়ুন কবি, কথাসাহিত্যক ও সম্পাদক আনন্দ বাগচী

অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার ফিরে এসে প্রফেসর লেডীর সঙ্গে রিসার্চ শুরু করেন। প্রফেসর লেভীর সুপারিশে তাঁকে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসাবে নিযুক্তি দেওয়া হলো। ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন। তিনি প্রফেসর লেভীর সাথে ভারতের নানান বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যাথেমেটিকাল সেমিনারে যোগ দিতেন এবং তাঁর সাথে অনেক পেপার পাবলিশ করেন। এই সময় হিন্দু-মুসলমান বিরোধ চরমে উঠে, ফলে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারারের পদ খালি হলেও তিনি সেখানে যোগ দিতে পারেন নাই। তখন জীবিকার জন্য তিনি চিটাগাং কলেজে লেকচারার হিসাবে যোগদান করেন ।

সেখানে তখন কলেজে গভর্নিং বডিতে দুই জন শিক্ষক প্রতিনিধি নিয়োগের নিয়ম ছিল। কলেজে মুসলমান শিক্ষক কম থাকার ফলে দুইজন প্রতিনিধিই ছিলেন হিন্দু। তাঁদের কৌশলের কারণে কলেজের গভর্নিং বডির নির্বাচনে, হিন্দুরা বিভক্ত হয়ে পড়লে, দুই জন মুসলমান প্রতিনিধি নির্বাচিত হলেন। হিন্দু শিক্ষকদের আন্দোলনের ফলে, সরকার থেকে এই মর্মে নির্দেশ এলো যে, দুই জন সদস্যের একজন হবেন মুসলমান এবং অপরজন হবেন অমুসলিম। কিছুদিন পরেই তিনি কোলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে বদলি হয়ে আসেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে তাঁকে অঙ্কের সাথে জোতির্বিদ্যাও পড়াতে হতো। এই কলেজে একটা ছোট অবজারভেটারি ছিল। সেই অবজারভেটারি-তে ছাত্রদের টেলিস্কোপে আকাশের গ্রহ নক্ষত্রের গতিবিধি দেখান হতো। এই সময়েই, তিনি জোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধে বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন। এই সময়ে নানান সাময়িকীতে তিনি জোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধে লেখালিখি শুরু করেন।

আরও পড়ুন কবি, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক বিমল কুণ্ডু

জোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধে নানা কাহিনী, কৌতূহলকর উপাখ্যান মোহাম্মদী, সাওগাত, পাঠশালা ইত্যাদি পত্রিকায় তাঁর লেখা বেরুতে শুরু করল। তাঁর মাতৃভাষায় বিজ্ঞান লেখা এবং জোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহ দেখে তাঁর অগ্রজ জনাব আকবর আলী সাহেবের উৎসাহে তিনি মাসিক ইমরোজ (পঞ্চাশ দশকের একটি উচ্চমানের সাহিত্য পত্রিকা) পত্রিকাতে এ মাসের আকাশ’ নাম দিয়ে কতগুলি প্রবন্ধ লেখেন। সেই সাথে, সম্ভবত ১৯৫০ সাল থেকে, তিনি তখনকার পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকাতে নিয়মিতভাবে মান্থলি নাইট স্কাই” নামে কলাম লিখতেন। প্রতি মাসের ১লা তারিখে এই কলাম বের হতো। এতে আকাশে গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান দেখিয়ে একটা ছবি এবং সেই সঙ্গে অমাবস্যা, পূর্ণিমা কবে হবে, কোন দিন ঈদের চাঁদ দেখা যাবে সে সব নিয়ে আলোচনা থাকতো ।

দেশ বিভাগের সময়ে অধ্যাপক আব্দুল জব্বার প্রেসিডেন্সি কলেজে ছিলেন এবং স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানের পক্ষে অপশন দিয়েছিলেন। বিভক্তির সময়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিলেন যে সব সরকারি মালামাল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সমভাবে বন্টন হবে। একজন হিন্দু শিক্ষকের সঙ্গে কলেজ লাইব্রেরি বইপত্রসহ অন্যান্য সকল মালামাল ভাগাভাগির দায়িত্ব পড়ে অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বারের উপর। অনেক কষ্ট ও তর্কাতর্কির পর বইপত্র ও অন্যান্য মালামাল ভাগাভাগি হল। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে কোন মালামালই পাকিস্তানে আসে নাই।

কোলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ছেড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহী কলেজে যোগদান করেন। তাঁর উপর অঙ্কের সাথে এ্যাস্টনোমি বা জোতির্বিজ্ঞান পড়ানোর দায়িত্ব অর্পিত হল। রাজশাহী কলেজে একটি দূরবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়াও কলেজ গ্রন্থাগারে জোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক বেশ কিছু সংখ্যক বইও ছিল। এর মধ্যে জপদ্বানন্দ রায় রচিত ‘নক্ষত্র চেনা’ বইটি তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। বইয়ে আকাশের চিত্র দেখে তিনি তারা চিনতে আরম্ভ করেন। বস্তুতপক্ষে, জগদ্বানন্দ রায়ের বইটিই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং তিনি জোতির্বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং জোতির্বিজ্ঞান চর্চা আরম্ভ করেন।

আরও পড়ুন অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার-
১ম পর্ব
৩য় পর্ব
৪র্থ পর্ব
৫ম পর্ব
৬ষ্ঠ পর্ব
৭ম পর্ব
৮ম পর্ব

 

 

ঘুরে আসুন আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলফেসবুক পেইজে

অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার (২য় পর্ব)

Facebook Comments Box

মোহাম্মদ আব্দুল মতিন, অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল জব্বারের দ্বিতীয় পুত্র। তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি) একজন সদস্য এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৪৫ সালের ১১ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।

error: Content is protected !!